দ্বিতীয় পর্ব
এক সময় সারাদেশে স্বদেশি আন্দোলনের ধারা দু’টি খাতে প্রবাহিত হচ্ছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ একদল মানুষ ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি দিতে দিতে শোভাযাত্রা সহকারে মানুষের মধ্যে দেশপ্রীতির উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল। আর অন্যদল চরমপন্থা অবলম্বন করে শক্তিসাধনার মাধ্যমে দেশ থেকে ব্রিটিশ সরকারকে উৎখাত করার কর্মযজ্ঞে সামিল হয়েছিল। সেই শক্তি সাধনার সূচনা হয়েছিল মহারাষ্ট্রে ‘শিবাজি উৎসব’-এর মধ্য দিয়ে। সেই সময় চরমপন্থী স্বাধীনতা সংগ্রামীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ‘গুপ্ত সমিতি’ গঠন করে ব্রিটিশ সরকারকে সমূলে উৎখাত করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন প্রমথনাথ মিত্র, শ্রীঅরবিন্দ প্রমুখ বিপ্লবীগণ। ঢাকা, কলকাতা ছাড়াও দেশের সকল প্রান্তে সেই সমিতির কর্মধারা ক্রমান্বয়ে প্রসার লাভ করেছিল। চরমপন্থী বিপ্লবীরাও কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দ মঠ’ ও ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতের দ্বারা গভীরভাবে প্রেরণা লাভ করেছিলেন। অনেক বিপ্লবী তাঁদের পিতৃদত্ত নাম পরিত্যাগ করে ‘আনন্দ মঠ’-এর সন্তান দলের ন্যায় ভবানন্দ, জীবানন্দ প্রভৃতি নাম গ্রহণ করেছিলেন। সন্তানদল ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে মুখর হয়েছিল। আমাদের বিপ্লবীরাও সেইরূপ এদেশ থেকে ইংরেজদের উৎখাত করবার উদ্দেশ্যে কৃতসংকল্প হয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে ‘আনন্দ মঠ’-এর প্রতি বিপ্লবীদের আকর্ষণ সৃষ্টি হয়েছিল মূলত দু’টি কারণে। একটি হচ্ছে, বাহুবলে ইংরেজ বিতাড়ন এবং অন্যটি হচ্ছে, শক্তির সঙ্গে ধর্ম সম্মিলন। আসলে বিপ্লবীদের নির্দেশিকা দিত শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতা গ্রন্থখানি। ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি উচ্চারণ করতে না পারলেও চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলায় তাঁরা নির্ভীকচিত্তে ‘বন্দে মাতরম্’ মন্ত্র উচ্চারণ করতেন। ক্ষুদিরাম, মাস্টারদা সূর্য সেন, চন্দ্রশেখর আজাদ, মদনলাল ধিংড়া, রামপ্রসাদ বিসমিল প্রমুখ বিপ্লবীরা তো মুখে ‘বন্দে মাতরম্’ মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে ফাঁসির মঞ্চে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের জীবনের সঙ্গে এই মন্ত্র যেন অভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। পরাধীনতার সকল অন্ধকার অপসারিত করতে ‘আনন্দ মঠ’ ও ‘বন্দে মাতরম্’ যেন বিপ্লবীদের কাছে এগিয়ে যাওয়ার মহামন্ত্র হয়ে উঠেছিল!
স্বাধীনতার সেই অগ্নিযুগে মুম্বইয়ের একটি সাময়িকপত্রে ১৯০৬ সালে মার্চ মাসে ‘বন্দে মাতরম্’ নিয়ে একটি প্রবন্ধ লেখার অপরাধে বিনায়ক দামোদর সাভারকার আন্দামানে নির্বাসিত হন। লোকমান্য বালগঙ্গাধর তিলক ‘বন্দে মাতরম্’-এর সমর্থনে একটি রচনা লেখায় তাঁকে মান্দালয় জেলে পাঠানো হয়েছিল। হায়দরাবাদের নিজাম ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি দেওয়ায় এক কিশোরকে প্রাণদণ্ড দিয়েছিল। ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীত পরিবেশন করায় এক ছাত্রকে আঠারো বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাঞ্জাবের অধিবাসীরা তো সামাজিক ভাবে পরস্পরকে অভিবাদন জানাতেন ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি উচ্চারণ করে। মহারাষ্ট্রের সর্বত্র এটি কালক্রমে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভকরে। এই সংগীতের ওপর সেখানে পাঁচটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কলকাতা, দিল্লি ও গুজরাট থেকে সেই সময় ‘বন্দে মাতরম্’ নামে বহু সংখ্যক সাময়িকপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। ‘আনন্দ মঠ’-এর প্রথম হিন্দিসংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৫ সালে। অন্যান্য ভারতীয় ভাষাতেও এটি পরবর্তীকালে অনূদিত হয়েছিল। তবে ‘আনন্দ মঠ’-এর আখ্যানের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার বহু পূর্বে সুপ্রসিদ্ধস্বদেশ চেতনার সংগীত ‘বন্দে মাতরম্’ দেশের সর্বত্র প্রচার লাভ করেছিল। লেখক প্রেমচন্দও এইসংগীতের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পর প্রবাসী ভারতীয়দের কাছেও এই ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতটি পৌঁছে যায়। ইউরোপ, আমেরিকা ও দক্ষিণ আফ্রিকা সহ প্যারিস, লন্ডন, মালয়, যবদ্বীপ, বালী, শ্যাম প্রভঋতি দেশের প্রবাসী ভারতীয়রা ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি উচ্চারণ করে তবেই পারস্পরিক সৌজন্য বিনিময় করতেন। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে শ্রীঅরবিন্দ যথার্থই ‘ঋষি’ আখ্যায় ভূষিত করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, তিনি ছিলেন ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় যে, তাঁর মৃত্যুর বারো বছরের মধ্যে তাঁর জীবনী কোনোমতে প্রচার না করার জন্য বঙ্কিম আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর ঠিক বারো বছর পরে ‘বন্দে মাতরম্’ জাতীয় মন্ত্রের মর্যাদা লাভ করেছিল।
বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দ মঠ’-এর ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতের বিরুদ্ধে একটা সময় সাম্প্রদায়িকতা ও পৌত্তলিকতার অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে একথা সত্য যে, লেখক এই গ্রন্থে সন্তানদল ও ইংরেজদের মধ্যে সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছিলেন। তা কখনওই ইসলামের বিরুদ্ধে ছিল না। লেখক এইগ্রন্থ রচনার মূল প্রেরণা বাসুদেব বলবন্ত ফড়কের রচনা থেকেলাভ করেচিলেন। সেখানেও ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা হয়েছিল। তাই, এটি কোনোমতে সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট হতে পারে না। অন্যদিকে, তাঁর বিরুদ্ধে পৌত্তলিকতার অভিযোগ তোলা কিন্তু অর্থহীন। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতের মধ্য দিয়ে পৌত্তলিকতার জয়সূচক বাণূ কখনওই………….। হিন্দুদের দেবদেবীকেও তিনি স্তব-স্তুতি করেননি। বরং সকল দেবদেবী অপেক্ষা দেশমাতৃকাকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসানো হয়েছে। বঙ্কিমের কাছে তাঁর দেশজননী হচ্ছে দুর্গা, লক্ষ্মী বা সরস্বতী। তাঁর ‘বন্দে মাতরম্’ আধ্যাত্মিকতার কোনও মন্ত্র নয়। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন ”স্বদেশপূজার প্রবর্তক এক নবীন অধ্যাত্মবাদের ভগীরথ।” বঙ্কিম সাহিত্যের সমালোচকরা বলেন, তাঁর সাহিত্যে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে যে বিদ্বেষের কথা প্রচার করা হয় তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এ সংক্রান্ত বিষয়ে মূলত ঐতিহাসিক ঘটনাবৃত্তকে আলোকপাত করা হয়েছে। তাঁর রচনায় তিনি সত্য ঘটনাকে কেবলমাত্র উল্লেখ করেছেন। এর বেশি কিছু নয়। আসলে সাহিত্যে কোনোকিছুর ভাব ও কল্পনাকে পাঠকের কাছে তুলে ধরতে গিয়ে তিনি মাঝেমধ্যেই ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ব্যবহার করেছিলেন। অবনীন্দ্রনাথের অঁকা ‘ভারতমাতা’-কে এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। মূল ঘটনাটি হল, বঙ্গবিচ্ছেদের বিষয়টি যখন বারে বারে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে, তখন ব্রিটিশ সরকার এদেশের হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকরার কাজে নেমে পড়ে ছিল। ঠিক সেই লক্ষ্যে লর্ড কার্জনের সেই বিভেদনীতিকে বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে পূর্ববঙ্গের প্রথম গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলার উঠে পড়ে লেগেছিলেন। সমগ্র দেশে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষ যখন স্বদেশি আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন ঠিক সেই সময়ে ইংরেজসরকার এদেশের মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির কাজে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। আলিগড়ের বাসিন্দাসৈয়দ আহমদ মনে করতেন যে, হিন্দু ও মুসলমান দু’টি আলাদা সম্প্রদায়। তাই, মুসলমানদের জন্য শাসনবিধি সংস্কারে পৃতখ প্রতিনিধিত্ব প্রয়োজন। এ সংক্রান্ত দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনার জন্য একটি সংগঠন তৈরি করার উদ্দেশ্যে ১৯০৬ সালে সৈয়দ আহমদ একবার ঢাকায় এসেছিলেন। সেই বছর ৩১শে ডিসেম্বর ঢাকায় স্থানীয় নবাবের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি নতুন গণ সংগঠন মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্বদেশি আন্দোলনের সেই উত্তাল তরঙ্গের দিনে ঢাকায় এই ধরনের নতুন একটি গণ সংগঠনের প্রতিষ্ঠা রীতিমত একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। মুসলমান সমাজের একটি বড়অংশ সেদিন স্বদেশি আন্দোলনে যোগদান করলেও ব্রিটিশের চক্রান্তে মুসলমান সমাজের অবশিষ্ট অংশের মানুষেরা মুসলিমলিগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের সম্প্রদায়গত উন্নয়নের দাবিতে সভা-সমাবেশ করতে বিশেষ তৎপর হয়ে উঠেছিল। ঢাকার নবাব ইংরেজদের মতাদর্শে পরিচালিত হতেন। কিন্তুতাঁর ভাই অতিকুল্লা স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। কলকাতার রাজাবাজারে হিন্দু ও মুসলমানদের এক সম্মিলিত সভায় ১৮০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আব্দুল রসুল সাহেব বলেছিলেন, ‘হিন্দু ও মুসলমান নাগরিকরা বাংলা মায়ের সন্তান। আমরা মাকে ভাগ হতে দেব না।‘ সেইসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলমান নাগরিকরা মিলিত হয়ে স্বদেশি আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। তাঁরা ব্রিটিশ সরকারের কঠোর দমননূতির তীব্র সমালোচনা করতেন। বরিশালের প্রাদেশি সম্মেলনে বহু মুসলমান নাগরিক সোৎসাহে যোগদান করেছিলেন। রাখিবন্ধন উৎসবেও মুসলমান সমাজসমানভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। জাতীয় শিক্ষা প্রবর্তনের আন্দোলনেও মুসলমানেরা সমানভাবেঅংশ নিয়েছিলেন। এছাড়া, মুসলমান কবি-সাহিত্যিক ও লোকশিল্পীরাও স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছিলেন। এতে স্পষ্ট হয় যে, সরকারের সেই বিভেদনীতির কৌশল কিন্তু সর্বাংশে সফল হয়নি। ইতিমধ্যে ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে সরকার বঙ্গভঙ্গ আইন রদকরে এবং এর অব্যবহিত পরেইশুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। তারপরেই বাংলার স্বদেশি আন্দোলনের ঢেউ দেশের সর্বত্র বিস্তার লাভকরে। অসহবযোগ আন্দোলন, লবণ আইন ও সাইমন কমিসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন তখন ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রেরণা থেকে প্রবল আকার ধারণ করে। প্রাদেশি স্বায়ত্তশাসনের অধিকার এদেশীয়দের হাতে তুলে দিয়ে ১৯৩৭ সালের ১লা এপ্রিল সরকার এদেশের নতুন শাসনবিধি চালু করে। ঠিক সেই মুহূর্তে দেশে কতিপয় সাম্প্রদায়িকতাবাদী নেতার মধ্যে দ্বিজাতিতত্ত্বের দাবি জোরদার হয়েছিল। এজন্য ব্রিটিশ সরকারই মূলত দায়ী ছিল। এরপর ওই বছর অক্টোবর মাসে কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির এক সভায় ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীত নিয়ে আলোচনা করা হয়। সেই সভায়বক্তারা এই সংগীতকে মুসলমান সমাজের কাছে অপমানজনকবলে মন্তব্যকরেন। এর কিছুকাল পরে কলকাতায় কতিপয় মুসলমান নাগরিক ‘আনন্দ মঠ’ গ্র্থে অগ্নিসংযোগ করে। সেই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস সভাপতি নেহরুজি ‘বন্দে মাতরম্’ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মনোভাব জানতে চেয়েছিলেন। তখন কবি লিখেছিলেন, ”বঙ্কিমচন্দ্রের সমগ্র ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতটি যদি উহার অন্যান্য ইতিহাসের সহিত পড়া যায় তাহা হইলে উহার এমন অর্থ করা যায় যাহার ফলে মুসলমানদের মনে আঘাত লাগিতে পারে, কিন্তু এই জাতীয় সংগীত যদিও সমগ্র সংগীত হইতে গৃহীত দুইটি প্যারা মাত্র, তথাপি উহা যে সর্বদা কেন সমগ্র সংগীতের কথাস্মরণ করাইয়া দিবে কিংবাযে ইতিহাসের সহিত দৈবক্রমে ইহা জড়িত তাহার কথা স্মরণ করাইয়া দিবে, তাহার যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ নাই।” এরপর কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভায় যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল তা হল, ”…thecommittee recommends that wherever the ‘Bande Mataram’ is sung at National gatherings only the first two stranzas should be sung, with perfect freedom to the organisers to sing any other song of an unobjectionable character, in addition to, or inplace of the ‘Bande Mataram’ song.” এর পরবর্তীকালে ১৯৩৮ সালে জিন্না তো ‘বন্দে মাতরম্’ সংগীতকে পরিপূর্ণ বর্জনকরার প্রস্তাবগান্ধীজির কাছে উত্থাপন করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট মধ্যরাতে সমবেত কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম্’ সংহীত সহযোগে অনুষ্ঠান শুরু করা হয়েছিল আর সমাপ্তি ঘটেছিল ‘জনগণমন’ দিয়ে। এরপর জাতীয় সংগীত নিয়েগণ পরিষদে এক আলোচনা সভার আয়োজনকরা হয়। তাতে পৌত্তলিকতার অভিযোগ তুলে ‘বন্দে মাতরম্’-কে বাদ দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এটি অর্কেস্ট্রার উপযোগী নয়। পরে অবশ্য তা অমূলক প্রমাণিত হয়। ১৯৪৭ সালের ২৯শে অক্টোবর গান্ধীজির এক প্রার্থনা সভায় দিলীপকুমার রায় ‘বন্দে মাতরম্’ ও ‘হিন্দুস্থান হামারা’ গান দু’টি পরিবেশন করেছিলেন। গান্ধীজি তাতে অতি পরিতৃপ্ত হয়েছিলেন। গণ পরি,দের এক সভায় ১৯৫০ সালের ২৪শে জানুয়ারি সভাপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদ ‘জনগণমন’-এর সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম্’-কে সমান মর্যাদা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তা কখনই সত্য হতে পারে না। কেননা, একটা জাতির দুটি জাতীয় সংগীত হতে পারে না।
আসমুদ্রহিমাচল সমগ্রজাতির প্রাণে স্বদেশপ্রীতিচর মহামন্ত্র হিসেবে পরাধীনতার সেই যুগে ‘বন্দে মাতরম্’ যে অফুরন্ত শক্তি সঞ্চার করেছিল তাতে দেশবাসী আজও গৌরবান্বিত। দেশের স্বাধীনতা লাভের পর সেই সগীতকে জাতীয় সংগীত রূপে মর্যাদা দেওয়া না হলেও, এটি এক স্বদেশচেতনার অমিতশক্তির মন্ত্রধ্বনি হিসেবে এর আবেদন কিন্তু সমগ্র জাতির কাছে চিরকাল অম্লান থাকবে। এই সংগীত সৃষ্টির সার্ধ শততম বর্ষের এই পুণ্যলগ্নে সমগ্র দেশবাসীর পক্ষ থেকে আমরা সেই অমর সংগীতস্রষ্টার প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রণতি নিবেদন করি।
তথ্যসূত্র্র
১. বন্দে মাতরম্ ও স্বদেশি আন্দোলন : চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, দেশ, সাহিত্য সংখ্যা, ১৩৯৫,পৃষ্ঠা: ৫০-৬১
২. বাংলাদেশের ইতিহাসে (৩য় ও ৪র্থ খণ্ড): রমেশচন্দ্র মজুমদার, ১৯৭১
৩.বঙ্কিমচন্দ্র ও মুসলমান সমাজ: রেজাউল করিম, ১৩৪১
৪. ভারতের জাতীয় আন্দোলন: প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, ১৯৬৫

