muridhanta

রান্নাবান্না মুড়িঘণ্ট এবং….

‘না না। এভাবে হয় না। তুই বলবি আর আমি এই আধ ইঞ্চি চুটুক দাড়িটা কেটে ফেলবো, এমনটা কথা ছিলো?’

‘ কী? কী দাড়ি? চুটুক ? ‘

‘ হ্যাঁ। এই যে নিচের ঠোঁটের ঠিক নিচে, চিবুক শুরুর আগেই শেষ হয়ে যাওয়া দাড়ি। এটাই চুটুক দাড়ি।’

‘ আচ্ছা বাবা। কাটতে হবে না তোর ইয়ে দাড়ি। তবে চুমু খাওয়ার সময় একটু অসুবিধে হয় সেটা তো বুঝিস? ‘

‘ তা ….মানে … সেক্ষেত্রে একটু ছোট করে দেওয়া যায়’ । এইসব কথা বলতে বলতে হুস করে পার্ক স্ট্রিট। মেট্রো থেকে বেরিয়ে ফুটপাথ দিয়ে অলস হাঁটা। বিশ্রম্ভালাপ চলছেই। মুলা রুঞ্জ এর সামনে টিনটিন কমিক্স । তারপর রাস্তা পেরিয়ে ফ্লুরি’স। একটা হ্যাম স্যান্ডউইচ দুভাগে। একটা মোক্যাচিনো ।

সৌনক আর এষা। ব্রায়ান এডামের আকোয়েটিকাতে কনসার্টে আলাপ। ২০২৪। দুজনেই উন্মাদের মত ‘ everything I do/ I do it for you ‘ গাইছিল। তখনই চোখে চোখ। চোখ বন্ধ করে মন। এখন ওরা সিচুয়েশনসিপে। মানে ওই ‘ বলতে পারো প্রেম নয়/ বেশ কাঙালপনাই হলো ‘ আর কী। পাকলে প্রেম। না পাকলে বাই বাই। আসলে দুজনেই ভালো চাকরিতে। সোশ্যাল মিডিয়ায় উপস্থিতি। এষার নাচ আর সৌনকের গান – গিটারে অবসর। আসলে ওসব কিছু হয় না। বাড়ির মানুষজন আর বন্ধুবান্ধব ঘিরে থাকা দুজন মানুষ। নিজেদের জন্যে একলা সময় বার করতে হিমসিম।

‘ রাজকন্যা তোকে ডেকেছে। ভয় পাস না। খাওয়াবে। ছবিতে তো বেশ রোগা পাতলা লাগে। ভেবেছে অপুষ্টি। তাই বাঙালবাড়ির রান্না খাওয়াবে তোকে। ‘

রাজকন্যা মানে এষার থাম্মী। বিক্রমপুরের জমিদারবাড়ির মেয়ে। তাই রাজকন্যা। দারুণ না?

‘ কিন্তু যদি রিলেশনশিপের প্রশ্ন করে? ‘সৌনক একটু দ্বিধায়।

‘ম্যানেজ করবি। আমি হেল্প করবো। তুই তো ম্যানেজ মাস্টার।’ এষা বিন্দাস। অগত্যা।

পরের রবিবার এষাদের আহিরিটোলার বাসভবনে দ্বিপ্রাহরিক ভোজন।

‘ তোর থাম্মিকে তো নূতনের যমজ বোন বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।’ ফিসফিস করে সৌনক । আসলে না বলে পারলো না। বৃদ্ধা এখন ৭৬। মাখন গলা রূপ। স্নিগ্ধতা। আভিজাত্য। টানা টানা চোখ মুখ। পায়ের পাতা দুটো সামান্য ফোলাভাব।

‘ তোমরা তো শুনলাম প্রবাসী বাঙালি। তাই ভাবলাম একটু কচু ঘেঁচু খাওয়াই। ‘ সস্নেহে মাথায় হাত রেখে সৌনককে আশীর্বাদ করেন রাজকন্যা। আন্তরিক। এষা থাম্মীকে জড়িয়ে ধরে গালে চকাস করে চুমু খায়। এমন এক সম্পর্ক যার কোনও ব্যাখ্যা হয় না। শুধু ভালোবাসা আর অহৈতুকি প্রশ্রয়। চোখে আনমনা জল এসে যায়।

শ্বেতপাথরের টেবিলে কুরুশের টেবিলক্লথ। কাঁসার বগিথালায় ভাত। থাম্মি বড় চামচে একটা সবজি মন্ড দিলেন। ওপর থেকে একটু ঝাঁঝালো সর্ষে তেল। একটা কাঁচা লঙ্কা।

‘ এটা হলো পটলের ভর্তা।’ এষা মোবাইল ফোনে রেকর্ড করছে। ‘ সবথেকে ভালো পটল ঝিকরগাছার। তা সে তো গেছে যশোরে। অগত্যা নদিয়ার পটলেই ভরসা। পটলের গা বেশটি করে ঘষে নিতে হবে। খোসা ছাড়িয়ে ফেললে সর্বনাশ। এবার মাঝখান থেকে দু ফালা। দানা ফেলে দিয়ে ছোট ছোট টুকরো। কড়ায় এক চামচ সরষে তেল আর এক চামচ ঘি। আধ চামচ কালোজিরা , কয়েকটা কাঁচা লঙ্কা আর তিন চার কোয়া রসুন। সব মিলিয়ে ভাজতে হবে।পরিমান মত নুন। পটল নরম হয়ে এলে নামিয়ে ঠাণ্ডা করে নিতে হবে। একটা পিঁয়াজ ছোট ছোট টুকরো করে নিতে হবে। ওই কড়াতেই খানিক নাড়াচাড়া। এবার বাটার পালা। শিল নোড়া হলে চমৎকার। না হলে মিক্সি ভরসা। ব্যস। একটু তেল ছড়িয়ে। আর কিচ্ছুটি লাগে না। একথালা ভাত খেত আমার কত্তাবাবু এই দিয়ে। ‘ সত্যিই। থাম্মির গল্প শুনতে শুনতে কখন যে পুরোটা পেটে চলে গেছে! একটাই বিশেষণ। অসাধারণ।

‘এইবার নায়কের আগমন।’ থাম্মি হেসে ওঠে। মুক্তো হাসি। ঝর্ণার মত, ঝাড়বাতির মত অনুরণন।

‘ তোমরা খাও মাছের মাথা দিয়ে সোনামুগ ডাল। আর বিক্রমপুরের আমরা খাই মুড়িঘন্ট । ‘

এটা কিন্তু ভালো করে রেসিপি বলতে হবে। তোমার রান্না আমার মা কে করতে বলবো।’ আন্তরিকতা এক অবাক ছোঁয়া। আপনি কখন যেন অজান্তেই তুমি হয়ে যায়।

‘ নিশ্চয়ই। হাতে হাত ধরলেই তো সীমানা ছাড়িয়ে যায়। ‘ রাজকন্যার কথায় প্রজ্ঞার রজনীগন্ধা। সৌনকের পাতে মুড়িঘণ্ট দিতে দিতে থাম্মি বলতে থাকে।’ বড় টাটকা কাতলা মাছের মাথা। কিলোখানেকের মত। ভালো করে পরিষ্কার করে মাঝারি কটা টুকরো। ঘিলু বেরিয়ে না গেলেই ভালো। এবার ছোট দানার সুগন্ধী আতপ চাল। গোবিন্দভোগ, তুলাইপঞ্জি , রাধামাধব যা হোক। ছয়শো গ্রামের মত। ভালো করে ঘষে ঘষে ধুতে হবে। অন্তত বার তিন চার। চাল ধোয়া জল টলটলে না হলেই নয়। জল ঝরিয়ে শুকনো কাপড়ে মেলে দিতে হবে। শুকোনোর জন্যে। চাইলে রোদে দেওয়াও যায়। কাক চিল চড়াই যেন খবর না পায়। ‘

রাজকন্যার হাসি যেন মধুঝরা।
‘ অল্প জলে এক চামচ হলুদ গুঁড়ো আর এক চামচ নুন ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে। এই মিশ্রণটা মুড়োর টুকরোগুলোতে ভালোভাবে মাখিয়ে আধ ঘন্টা। ‘ পাতে আরও খানিকটা মুড়িঘন্ট দিয়ে থাম্মি বলতে থাকে।’

একটা বড় কড়া। এক চামচ সর্ষে তেল। এক চামচ গাওয়া ঘি। ধোঁয়া উঠলে এক মুঠো কাজু বাদাম। সোনালি বাদামি রঙ এলেই ছোট দানার লালচে কিসমিস এক মুঠো। খুন্তি চালু থাকবে। এক মিনিট পর চালটা। হালকা থেকে মাঝারী আঁচ। খুন্তি আরেকটু দ্রুত। খানিক পরে চালটা যখন বেশ ভঙ্গুর হয়ে আসবে, তখন নামিয়ে নেওয়া।

‘দুটো আলু ডুমো ডুমো করে কেটে যা হোক তেল দিয়ে এক চিমটে নুন ছড়িয়ে আধভাজা করে রাখবে।’

‘এবার কড়াইতে তিন চার চামচ সর্ষে তেল দিয়ে একটা তেজপাতা। মাছটা দিয়ে বেশটি করে মাঝারি আঁচে নাড়তে হবে। সামান্য লালচে ভাব এলে আর আঁশটে গন্ধ কমে এলে নামিয়ে দেবে।’

ওই কড়াতেই আধ কাপ মত সর্ষে তেল। তিন চারটে শুকনো লঙ্কা, গোটা কয়েক ছোট এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ। আধ চামচ সা জিরে, পাঁচ ছয়টা গোল মরিচ। আঁচ কিন্তু একদমই কম। মিনিট খানেক পর এক চামচ আদা বাটা। দু চামচ দুধে গোলা একটু হিং। এবার এক চামচ করে লঙ্কা গুঁড়ো, হলুদ গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো। আধ চামচ গুঁড়ো গরম মশলা। মশলা তেল ছাড়লে আলু আর আধকাপ কড়াই শুটি। দু মিনিট নাড়াচাড়া। এবার মাছ। মসলাটা ভালো করে মিশে গেলে ওই চালের মিশ্রণ। খুন্তি চলুক। এবার গরম জল। চাল মাছ ঠিক ডুবু ডুবু। নাড়াচাড়া করে চাপা। তিন চার মিনিট পর পর ঢাকনা খুলে খুন্তির কাজ। একটু সাবধানে। ঘণ্টতে সব উপাদানের আকার যেমনটি থাকবে, তেমনটি। মিলেমিশে ছ্যাঁচড়া হয়ে না যায়। এমনি করে মিনিট দশ বারো। ওপর থেকে এক চামচ ঘি ছড়িয়ে নামিয়ে
হয়।

‘একটানা কথা বলে একটু হাঁপিয়ে উঠেছেন থাম্মি । মুখের হাসি কিন্তু অবিচল।

‘ বাপরে। বেশ কঠিন কাজ। আমি তো খেয়েই খুশী।’ সৌনকের নির্বিকার স্বীকারোক্তি।

‘কিন্তু, তোমার মুখে যে তৃপ্তিটা আমি দেখতে পাচ্ছি, এটার দাম যে লাখ টাকা! রান্না তো একটা শিল্প। ঘাম না ঝরিয়ে, মাথা না ঘামিয়ে, কোন শিল্পটা হয় শুনি? ‘ অকপট রাজকন্যা।

‘ থাম্মি , তুমি যেন একটা গল্প বলছিলে। স্বাদ গন্ধ আর চোখে দেখার এক অনুভূতি। ‘

এষা ওর আদরের ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরে। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে সৌনক।

‘ শেষ পাতে আমের আচারটা কিন্তু ফাঁকিবাজি। দক্ষিণেশ্বর মায়ের মন্দিরে গত সপ্তাহে গিয়েছিলাম। ওখানেই এক বুড়ি কিনিয়েই ছাড়লো। তবে ভাজা মসলাটা কিন্তু খাসা দিয়েছে। এটাও তো একটা হস্তশিল্প । নাকি? ‘

ভরপুর খাওয়ার শেষে পশ্চিমের বারান্দায় আরামকেদারায় বসে ছিলো সৌনক । গঙ্গার হাওয়া আসছে। মাঝনদীতে লঞ্চের আনাগোনা। একটা অদ্ভুত প্রশান্তি। মনটা খুউব শান্ত লাগছে। আপনজন। নিজের মানুষ। খুব কাছের। তাই কি? ঘুম ঘুম আসে চোখে।