“গত সপ্তাহে আমি মেদিনীপুর গিয়াছিলাম। লঙ্গরখানায় আহারের জন্য আসিয়া আমার সম্মুখেই দুজনের মৃত্যু হইল। আহার্য দর্শনে এক ব্যক্তি এতটা উত্তেজিত হয় যে, মুখে অন্ন পৌঁছিবার পূর্বেই লোকটি অজ্ঞান হইয়া পড়ে। তখন তাকে অপসারিত করিতে হয়। অভিযোগ আসিল, মেদিনীপুরের হাসপাতালে বেড খালি থাকিতেও লোকে রাস্তায় পড়িয়া মরিতেছে।”
১৯৪৩ সালে ১৭ সেপ্টেম্বর বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক পরিষদে শ্যামাপ্রাসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর বক্তৃতায় এই ভয়ংকর ছবিটি তুলে ধরেছিলেন। পঞ্চাশের মন্বন্তরের বিষ দংশনে তখন গোটা বাঙলা জর্জরিত। আকালের জেরে ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলা জুড়ে মৃত্যুর মিছিল। তারই সাবুদ মেলে শ্যামাপ্রাসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ বইটি থেকে। সে সময় ভুখা অর্ধমৃত মানুষগুলির মুখে খাবার তুলে দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টায় তিনি বাংলার নানা প্রান্তে ছুটে বেরিয়েছিলেন। ইতিহাসের পাতায় বাঙলার এই অন্যতম সুসন্তানের একটি বিশেষ রাজনৈতিক পরিচয় অবশ্যই আছে। কিন্তু লক্ষ্যনীয় বাংলার মানুষের সেই চরম দুঃসময়ে তিনি তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের গণ্ডি পেরিয়ে এক প্রকৃত জননেতার দ্বায়িত্ব পালন করেছিলেন। যার তুলনা মেলা ভার। তখনকার নানা অভিজ্ঞতা এবং তৎকালীন তাঁর নানা বক্তব্য-রচনার সংকলন নিয়ে ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ বইটি পয়লা পৌষ, ১৩৫০ বঙ্গাব্দে (ডিসেম্বর ১৯৪৩) প্রকাশিত হয়। যা ঐতিহাসিকভাবে শুধু একটি বিশেষ সময়ের দলিল নয়। তা ইতিহাস থেকে কঠিন শিক্ষা নেওয়ারও পাঠ দেয়।
কারণ শ্যামাপ্রাসাদ এই গভীর সংকটের গোড়া থেকেই বার বার জানিয়েছিলেন, এই আকাল বা দুর্ভিক্ষ আদতে ‘man made’। তাঁর ব্যাখ্যায়, “…পঞ্চাশের মন্বন্তরও বাঙলার ইতিহাস চিরদিন মসিচিহ্নিত করিয়া রাখিবে। … দুধের অভাবে কত ছেলে মায়ের কোলে মরিয়া গেল, ডাস্টবিনে মানুষ পশুর সংগে কাড়াকাড়ি করিয়া উচ্ছিষ্ট খাইল, এ দৃশ্য মাসের পর মাস আমরা চোখে দেখিয়াছি। … দুর্ভিক্ষ একদিনে আসে নাই। করাল মন্বন্তর ধীরে ধীরে বাংলাকে গ্রাস করিয়াছে। … এই মন্বন্তর কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য ঘটে নাই; যাহারা… বাংলাদেশ শাসনের জন্য দায়ী তাঁহাদের অনুসৃত ভ্রান্ত নীতির ফলেই ইহা ঘটিয়াছে। অধিবাসীরা আজ মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে আসিয়া পৌঁছিয়াছে।…”

এক দীর্ঘ সময় ধরেই শ্যামাপ্রাসাদকে ঘিরে বিশেষ কিছু ন্যারেটিভে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই তিনি সাম্প্রদায়িকতা দোষে দুষ্ট, এমন ‘প্রচার’ চালানো হয়েছে। এই অপপ্রচার কিন্তু বাঙালি জনজাতির ইতিহাসের বিকৃতি ঘটায়। এর সাক্ষ্য মেলে তাঁর বক্তব্য থেকেই। কারণ তিনি দুটো ভাতের অভাবে মৃত্যুর মিছিল প্রতিহত করতে এমন আবেদনও করেছিলেন, “…বিপদের সম্মুখে আমরা ঐক্যপন্থা গ্রহণ করিব। উত্তর পুরুষেরা যেন বলিতে পারে, আমরা বিবাদ – বিসম্বাদ করিয়াছি, কিন্তু জাতির দুঃসময়ে মিলিত শক্তিতে দুর্বার হইয়াছি। হিন্দু-মুসলমান-খৃষ্টান- সকলের পরম প্রিয় মাতৃভূমি রক্ষার জন্য প্রত্যেকেই আমরা ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতি, দল-বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতা পরিহার করিয়া এই পরম মুহূর্তে সংহত ঐক্যবদ্ধ মহাজাতি রূপে দাড়াইব।…”
বস্তুত, ১৯৪৩ সালের (১৩৫০ বঙ্গাব্দ) ভয়াবহ পঞ্চাশের মন্বন্তরে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ত্রাণ কার্যে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। এই পর্যায়ে অভূতপূর্ব খাদ্যসংকট ও তার জেরে প্রাণঘাতী দুর্ভিক্ষের মোকাবিলায় তিনি ব্রিটিশ সরকারের সমস্ত রকম অসহযোগিতা উপেক্ষা করে বিভিন্ন ত্রাণ সংগঠনগুলিকে একত্রিত করেন। বিশেষ তহবিল গড়ে তোলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাজারে ব্রিটিশ সরকারের ভ্রান্ত নীতির জেরে আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতির সমস্যাও দানা বেঁধে উঠেছিল। এর ফলে বাংলা ও ওড়িশায় শুধু যে চাল বা খাদ্য সামগ্রীর ভয়ংকর মূল্যবৃদ্ধি হয় তা নয়; আটপৌরে পরিধেয় বস্ত্র এর দামও এত বেড়ে যায় যে নিরন্ন, প্রান্তিক মানুষদের লজ্জা নিবারণে কাপড়ের সংস্থান করাও দুরুহ হয়ে ওঠে। সেই সংকটকালে মন্বন্তরপীড়িত দুর্গতদের অন্ন-বস্ত্রের সংস্থানে শুধু কলকাতার গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি সরাসরি ত্রাণের তদারকী করতে বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতেও ছুটে যেতেন।
তিনি তাঁর শাণিত লেখনিতেও ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর করুণ অভিজ্ঞতার নানা আখ্যান। শ্যামাপ্রসাদের কলমে প্রায় আশি বছরেরও আগেকার সেই সব ‘আঁখো দেখা হাল’ আজকের দিনে পড়লেও রক্ত হিম হয়ে যায়। “…কাঁথিতে শিয়াল কুকুরে যথেচ্ছ শব দেহ ভক্ষণ করিতেছে। এইসব জন্তুকে গুলি করিয়া মারিবার হুকুম দেওয়া হইয়াছে। … কলিকাতায় নিরাশ্রয় ও অনশনক্লিষ্ট লোকেদের অবস্থা যতই হৃদয় বিদারক হউক-মফস্বলের শহরে ও গ্রামে যাহা ঘটিতেছে, তাহার তুলনায় ইহা কিছুই নয়। ছিন্ন বস্ত্র পরিহিত কঙ্কালসার নর-নারী ও শিশুর দল জাতি ধর্ম নির্বিশেষে আহারের অভাবে মৃত্যুমুখে চলিয়াছে। এসব অসংখ্য দৃশ্য আমি নিজে প্রত্যক্ষ করিয়াছি।…”

সঙ্গে শ্রেনিগত অবস্থানের নিরিখে মন্বন্তরের দিনগুলিতে অস্তিত্বরক্ষায় বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রামের ভিন্ন মাত্রাটিও শ্যামাপ্রসাদের নজর এড়ায়নি। তিনিই অকপটে জানিয়েছেন, “অনশনে ও স্বল্পাহারে লোকের জীবনীশক্তি এত কমিয়া গিয়াছে যে অবিলম্বে উপযুক্ত ব্যবস্থা না হইলে বাংলাদেশের সর্বনাশ হইবে।… আর এক শ্রেনীর লোকের জন্য কোনও ব্যবস্থাই হইতেছে না – ইহারা দরিদ্র মধ্যবিত্ত শ্রেনী। (যাঁরা) লঙ্গরখানায় আসিয়া চাল জোগাড় করিতে পারেন না, ভিক্ষা করিতে পারেন না, একটি পথ ইহাদের সামনে বিস্তৃত-অনাহারে তিলে তিলে মৃত্যু বরণ করা।…”
শ্যামাপ্রসাদের বইতে ‘দায়ী কে’ শীর্ষক অধ্যায়টিতে শ্রেনি-গত বিশ্লেষণে আকালের কালে দগ্ধ, বিপন্ন মধ্যবিত্তের নিঃসীম টানাপোড়েনের যে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, শুধু বিংশ শতকের মধ্য ভাগে নয়, তা সর্বকালীন সত্য। “…ভূমিহীন গৃহহীন দরিদ্র শ্রেনীর দুর্গতির মাত্রা অবশ্য সর্বাধিক; কিন্তু মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়েরও যে সকল পরিবার সাধারণ সময়ে কোন প্রকারে অস্তিত্ব বজায় রাখিয়া চলিতেন, আজ নিতান্ত মর্মান্তিকভাবে তাঁহাদেরকে মৃত্যু বরণ করিতে হইতেছে।…”

বিশেষ করে আজকের বাংলায় রাজনীতি বা সমাজ জীবনের সর্বত্রই বাঙালী মধ্যবিত্ত সত্তার বিনির্মাণ- ই যেখানে দস্তুর (বা ফ্যাশনও বলা চলে!) সেই প্রেক্ষিতে শ্যামাপ্রসাদের এক অমোঘ ‘চেতাবনী’ চলতি সময়েও ঘোরতরভাবে প্রাসঙ্গিক। “… ইহারা (মধ্যবিত্ত) আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের মেরুদন্ড। জাতির পক্ষে অত্যাবশ্যকীয় সেবা চিরদিনই ইহারা করিয়া আসিয়াছেন। বাংলাকে বাঁচাতে হইলে ইহাদের রক্ষা করিতে হইবে।…”
গ্রন্থের সূচনাতেই শ্যামাপ্রসাদ বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। সেই অংশটি হল, “…অলংকারগুলি বিভক্ত হইলে একজন দস্যু বলিল, “সোনা রূপা লইয়া কি করিব, একখানা গহনা লইয়া আমাকে এক মুঠা চাল দাও, আজ কেবল গাছের পাতা খাইয়া আছি।” … সকলেই সেই রূপ বলিয়া গোল করিতে লাগিল, ‘চাল দাও, চাল দাও, ক্ষুধায় প্রাণ যায়, সোনা রূপা চাহি না।’ … মারামারির উপক্রম। দলপতি দুই একজনকে মারিল। তখন সকলে দলপতিকে আক্রমণ করিয়া তাহাকে আঘাত করিতে লাগিল। দলপতি অনাহারে শীর্ণ ও ক্লিষ্ট ছিল, দুই এক আঘাতেই ভূপতিত হইয়া প্রাণ ত্যাগ করিল। তখন ক্ষুধিত, রুষ্ট, উত্তেজিত, জ্ঞান শূন্য দস্যুদের মধ্যে একজন বলিল, “…শৃগাল কুকুরের মাংস খাইয়াছি, ক্ষুধায় প্রাণ যায়, এস ভাই আজ এই বেটাকে খাই।” … দলপতির দেহ পোড়াইবার জন্য একজন অগ্নি জ্বালাইতে প্রবৃত্ত হইল।…”
শ্যামাপ্রসাদ অবশ্য পরিষ্কার বলেছেন, “…ছিয়াত্তুরে মন্বন্তরের ছবি বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠে প্রোজ্জ্বল হইয়া রহিয়াছে। আনন্দমঠের চিত্রের সংগে আজিকার দুরবস্থা মিলাইয়া দেখিলে বোঝা যাইবে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়াছে।…”

শুধু ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নয়, ইতিহাসবিদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সুবে বাঙলায় শ্যামাপ্রসাদ দুর্ভিক্ষ ও আকালের আখ্যানের ইতিবৃত্তান্তও পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবেই পেশ করেছেন। তাঁর এই বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে বাংলা যতই সুজলা সুফলা হোক না, দুর্ভিক্ষের বিষ বাষ্পে বাঙালি বারেবারে জর্জরিত হয়েছে। তাঁর কথায়, “… ছিয়াত্তুরে মন্বন্তরের পরেও অনেকবার দুর্ভিক্ষ হইয়াছে। যথা : – ১৭৮৩, ১৮৬৬, ১৮৭৩-৭৪, ১৮৭৫-৭৬, ১৮৮৪-৮৫, ১৮৯১-৯২, ১৮৯৭-১৯০০ ইত্যাদি।…”
অবশ্য শুধু ইতিহাসের বিশ্লেষনে থেমে থাকেননি শ্যামাপ্রসাদ, তাঁর বইতে তিনি একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয়ের অবতারণাও করেছেন। যা আলোচিত হয়েছে ‘মন্বন্তর কি আবার আসিবে’ শীর্ষক অধ্যায়টিতে। যার সূচনাতেই তিনি বলেছেন, “…বাংলাদেশ সংকট কাটাইয়া উঠিয়াছে, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়া আসিতেছে, অনেকের এইরূপ ধারণা।…” কিন্তু এতে যে নিশ্চিন্ত হওয়ার কোনও অবকাশ নেই, বাঙালিকে আপন স্বার্থেই যে সদা সতর্ক থাকতে হবে, সেই অমোঘ অশনি সঙ্কেতও তিনি দিয়েছেন। লিখেছেন “… আবার বিপর্যয় ঘটিবার আশঙ্কা আছে। এই বিষয়ে বিশেষ সাবধানতার প্রয়োজন।…একান্ত সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে, যেন কোনক্রমে খাদ্য সঙ্কট আর ঘটিতে না পারে।…”

তাঁর এই ‘চেতাবনি’ যে আজকের যুগেও বাঙালির জীবনে প্রযোজ্য, তা বললে তিলমাত্র অত্যুক্তি হয় না। কারন, আজকের একবিংশ শতকের বাংলাতেও প্রত্যন্ত নানা এলাকা থেকে খাদ্য সঙ্কট, তার জেরে অর্ধাহার, অনাহার, অপুষ্টি এমনকি মৃত্যুর খবরও মেলে।
যেমন ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ Wire পত্রিকায় প্রকাশিত ‘Unpaid for Months’: A Worker’s Death Exposes Bengal’s Tea Garden Crisis’ শীর্ষক একটি সংবাদ অনুযায়ী উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ারের একটি চা বাগানে এক মৃত শ্রমিকের স্ত্রীর অভিযোগ তাঁর স্বামী অনাহার- অর্ধাহারেই মারা গিয়েছেন। ওই বিধবা নারী জনিয়েছেন, মাসের পর মাস তাঁর স্বামীর বেতন মিলিত না। রেশন থেকে যে সামান্য চাল, গম মিলত তা-ই ছিল ভরসা। কিন্তু শুধু চাল, গম খেয়ে কি চলে! ফলে একটু আধটু সব্জি কেনার তাগিদে কোনও কোনও সময় রেশন থেকে পাওয়া চাল, গম খোলা বাজারে খানিকটা বেচে সামান্য সব্জি কেনা হত। শেষ পর্যন্ত অভাব অনটনে শুধু একবেলারই নুন ভাতের সংস্থান হত পরিবারটির। ক্রমেই গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন ওই চা শ্রমিক। তাঁর স্ত্রী জানিয়েছিলেন, স্বামীকে ডাক্তার দেখানোর পয়সাও তাঁর ছিল না। ফলে তিনি মারা যান।
এই মর্মান্তিক ঘটনা যে নেহাতই বিচ্ছিন্ন মাপের তাও বলা যায় না। কারণ, ওই এলাকায় স্থানীয় স্তরে প্রান্তিক চা শ্রমিকদের মধ্যে একটি সমীক্ষার ফলাফল থেকেই তীব্র খাদ্য সংকটের আভাস মেলে। তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপনে পুষ্টিগত স্তরের বিশ্লেষনেই এই সমীক্ষা চালায় রাইট টু ফুড এন্ড ওয়ার্ক ক্যাম্পেইন ও পশ্চিমবঙ্গ চা মজদুর সমিতি। তাতে দেখা যায় ৩৮ শতাংশ শ্রমিক গুরুতরভাবে অপুষ্টিতে ভুগছেন, ২৪ শতাংশ খুবই শীর্ণকায় (যাদের বি এম আই বা বডি মাস ইনডেক্স ১৭ এরও কম)| আর চোদ্দ শতাংশের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম।
ফলে কল্লোলিনী কলকাতার বুকে অজস্র রেস্তোরাঁ বা ফুড হাব ‘বিকশিত’ হলেও প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মতই রাজ্যের প্রান্তিক এলাকাগুলিতে এখনও ভুখা মানুষের অভাব নেই! সব মিলিয়ে, সে সময়ে শ্যামাপ্রসাদ মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে তাঁর রচনায়, পরিস্থিতি নিরীক্ষণ করে যে নানা মন্তব্য করেছিলেন, সেগুলি হাল আমলেও আমাদের ভাবিয়ে তোলে। যেমন, “… গবর্নমেন্টকে বণ্টনের দ্বায়িত্বও গ্রহণ করিতে হইবে। এ সম্বন্ধে কোনোরকম গোঁজামিল চলিবে না।…”
‘মন্বন্তর কি আবার আসিবে’ শীর্ষক অধ্যায়ে তিনি যে দামি কথাটি বলেছিলেন, তা আজকের বাংলাতেও এক বড় সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা হলো, ‘বাঙলার মানুষ ভিক্ষা চায় না; বাঁচিয়া থাকিবার যে অধিকার মানুষের আছে, তাহাই দাবি করিতেছে। যে কোনো সভ্য নামধেয় গবর্নমেন্টের ইহা প্রাথমিক কর্তব্য।…রাজনীতিক বা সাম্প্রদায়িক-কোন বিবেচনাই যেন গণ-মঙ্গলকে ছাপাইয়া না উঠিতে পারে। তবেই বাংলাদেশের সংকট মুক্তি ঘটিবে।…”
আসলে ছাপোষা বাঙালি গৃহস্থের আপন সন্তানকে ‘দুধে ভাতে’ রাখার যে চিরন্তন সোনালী স্বপ্ন, তা কি কোনদিন আদৌ সর্বাংশে পূর্ণতার স্বাদ পাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর মেলা ভার। ফলে অতীতের মন্বন্তরের দুঃস্মৃতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার দায় আজকের বাঙালিও এড়াতে পারে না, তা উচিতও নয়।
(তথ্য সূত্র: পঞ্চাশের মন্বন্তর, শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, দ্বিতীয় সংস্করণ, বৈশাখ ১৩৫১ বঙ্গাব্দ , বেঙ্গল পাবলিশার্স)
প্রচ্ছদ: শিল্পী শৈল চক্রবর্তী

