গতিই ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের মূলমন্ত্র। বলতেন গতিহীনতাই অপমৃত্যু। লেখার নেশা ছড়িয়েছিল তাঁর রক্তে, অনুভূতিতে। সংসারিক বাঁধা, নিত্য অশান্তি, দরিদ্রতা —- কোনও কিছুই তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। নিরন্তর চলেছিল তাঁর কলম। বাড়িতে অশান্তির ভয়ে লেখার তাড়নায় তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন রেল লাইনের ধারের শান বাঁধানো চত্বর। সাহিত্যিক, সম্পাদক অথবা পরিব্রাজক – কোনও একটি বিশেষণে তাঁকে আখ্যা দেওয়া খুবই কঠিন। তিনি সাহিত্যিক প্রবোধ কুমার সান্যাল।
‘কল্লোল’ পত্রিকা গোষ্ঠীর সাহিত্যিকদের মধ্যে যাঁরা অগ্রগণ্য – তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ১৯২৩ সালে প্রবোধকুমারের লেখা প্রথম গল্প ‘মার্জনা’ প্রকাশিত হয় ‘কল্লোল’ পত্রিকায়। তারপর থেকেই প্রবোধকুমার হয়ে ওঠেন ঐ পত্রিকার নিয়মিত লেখক গোষ্ঠীর একজন। ছাত্রাবস্থায় সিটি কলেজে প্রবাসী বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে খুব কাছ থেকে দেখে স্থির করে নিয়েছিলেন নিজের ভবিষ্যত। সেসময়ে প্রবোধচন্দ্রের মনে হয়েছিল গল্প লিখতে হবে, নইলে জীবনটাই বৃথা হবে। লিখতে শুরু করলেন সমাজের চারপাশের অবহেলিত, অপমানিত, নিপীড়িত, হতাশাগ্রস্থ মানুষদের গল্প। আর সেই সব গল্প লিখতে গিয়ে তিনি বলেছেন —-” পথেঘাটে গল্প খুঁজে বেড়াতাম — স্টীমার ঘাটে, চট কলের ধারে, রেল স্টেশনে, বিদেশের ধর্মশালায়, রেলের ওয়েটিং রুমে, তীর্থ যাত্রার মেলায়। আমি লিখতুম মজুর, জেলে, রাজমিস্ত্রী, গাড়োয়ান, মুদি, ফড়ে— এই সব চরিত্র নিয়ে। কারণ তাদের জীবন যাত্রাটা চোখে দেখতুম। তাদের নিয়ে গল্পের ইন্দ্রজাল সহজেই বুনতে পারতুম । ”

১৯২৩ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি প্রায় ২১৪ টি গল্প লিখেছিলেন। যদিও তাঁর গল্প লেখা শুরু হয়েছিল ছাত্রজীবন থেকেই। তবে সে সব গল্প আজ দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে। সে সময়ের চলতি পত্রিকাগুলিতে – উত্তরা, শঙ্খ, কালিকলম, মজলিস, প্রবাসী, ধূপছায়া, পরিচয় অসংখ্য লিখেছিলেন প্রবোধকুমার।
প্রখর বাস্তববোধ ও নিজের অভিজ্ঞতার বিস্তার ছিল প্রবোধকুমারের গল্পের বৈশিষ্ট্য। তাঁর লেখা গল্প – নিশিপদ্ম, দিবাস্বপ্ন, অস্তরাগ, চেনা ও জানা, গভীর, অবিকল, অঙ্গার, নীচের তলায়, ক্ষয়, সত্যি বলছি, ছি ছি ইত্যাদি আজও অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিভিন্ন পত্রিকায় লেখাগুলি পড়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ‘পরিচয়’ পত্রিকায় মূল্যবান মতামত দিয়েছিলেন তাঁর সম্বন্ধে। তবে লেখাজোকায় ব্যস্ত থাকলেও দারিদ্র তাঁকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেরিয়েছে। তাই অর্থের প্রয়োজনে গল্প লেখার পাশাপাশি করেছেন ব্যবসা এবং চাকরি । কখনো শিয়ালদহ লাইনে ট্রেনে ফেরি করেছেন ‘বিচিত্রা’ পত্রিকা আবার কখনো ‘উত্তরা’ পত্রিকার ক্যানভাসার হয়ে ঘুরেছেন বিহারে। কিছুটা সময় আবার আলমবাজারের জুটমিলে, শ্রীরামপুরের ডাকঘরে পোস্টমাস্টারের চাকরিও করেছেন। একটা সময় চাকরি পান ভারতীয় সৈন্য বিভাগে। বেড়াতে ভালোবাসতেন চিরকালই। চাকরির সূত্রে তাই ঘুরে নিয়েছিলেন ভারতের উত্তর – পশ্চিম সীমান্তের রাওয়াল পিন্ডির মারী পাহাড়ে, পেশোয়ারে। কাজের ফাঁকে বেরিয়ে পড়তেন শ্রীনগর, পহেলগাঁও,
বরমুলা, গাজি, ওয়াজিরিস্থানের মত পাহাড়ি পথে। লক্ষ করতেন সেখানকার মানুষদের আচার – আচরণ, খাদ্যাভাস, জীবন – যাপন ইত্যাদি। ভ্রমণের নেশা প্রবোধকুমারকে বার বার তাড়া করে বেরিয়েছে। সেই সুবাদেই তিনি বহুবার ছুটে গেছেন হিমালয়ের দুর্গম পথে কোন এক দুনির্বার আকর্ষণে। কেবল তীর্থযাত্রী হয়ে নয়, জানা-অজানা পার্বত্য প্রকৃতির অন্ধ আসক্তির আকর্ষণে। পরবর্তীতে, তিনি এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করেই তিনি পাঠকদের উপহার দিয়েছিলেন অনবদ্য সব ভ্রমণ কথা।

বাংলা সাহিত্য প্রবোধকুমারকে মনে রাখবে ‘ মহাপ্রস্থানের পথে’, ‘ দেবতাত্মা হিমালয় ‘ এবং ‘ উত্তর হিমালয় চরিত ‘ গ্রন্থগুলির জন্য। প্রবোধকুমারের লেখা ‘মহাপ্রস্থানের পথে ‘ গ্রন্থটি বাংলায় লেখা ভ্রমণ সাহিত্যের অভিমুখ বদলে দিয়েছিল। স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ রচনাটি পড়ে বলেছিলেন—-
‘ তোমার ভাষা পাঠককে রাস্তায় বের করে আনে । ‘ তাঁর লেখা ভ্রমণ সাহিত্যকে স্বাগত জানিয়েছিলেন — প্রমথ চৌধুরী, শরৎ চন্দ্র, রবীন্দ্রনাথের মতো দিকপাল সাহিত্যবৃন্দরা। সর্বোপরি আপামর পাঠককুল। ভ্রমণ পিপাসু মানুষটি আজীবন ঘুরে বেরিয়েছেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে বিদেশের মাটিতে। নিজেই বলেছেন, ‘প্রায় সমগ্র ভারতবর্ষ আমি ভ্রমণ করেছি। রেঙ্গুন থেকে দ্বারকাপুরী, কন্যাকুমারী থেকে বদরিকাশ্রম ও কাশ্মীরের সীমানা, তার দক্ষিণ-পশ্চিম আফ্রিদি রাজ্য। পরিব্রাজকের দুর্নামটা আমার আবাল্য। ‘ প্রবোধকুমারের লেখা — রাশিয়ার ডায়েরী, ভারত পথের যাত্রী, দক্ষিণ ভারতের আঙিনায়, রত্নদ্বীপ শ্রীলঙ্কা, পর্যটকের পত্র, অরণ্যপথ, দেশ ও দেশান্তর, পাঞ্জাব সীমান্তের পথে….ভ্রমণ সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।
ভ্রমণ সাহিত্য ছাড়াও মৌলিক উপন্যাস লেখাতেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ১৯২৮ সাল থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি প্রায় ৫৩ টি মৌলিক উপন্যাস লিখেছেন। ‘প্রমীলার সংসার’ নামে একটি উপন্যাস লিখে সাহিত্যজীবন শুরু করলেও যাযাবর, দুই আর দুয়ে চার, বাতাস দিল দোল, কাজললতা, কলরব, প্রিয় বান্ধবী, আলো আর আগুন, আঁকাবাঁকা, জলকল্লোল উপন্যাসগুলি আজও জনপ্রিয়তার শীর্ষে। তবে প্রবোধকুমারের লেখা ‘হাসুবানু ‘ উপন্যাসটি সর্ববৃহৎ। ১৯৪৭ – এর বাংলাভাগকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে লেখা বিতর্কিত এই উপন্যাসটি পূর্ব পাকিস্তান সরকার বিজ্ঞপ্তি জারি করে বাজেয়াপ্ত করেছিল। দেশভাগ ও স্বাধীনতা লাভ কেবল সমাজজীবনে বড় রকমের পরিবর্তন আনেনি, ব্যক্তিজীবনের মূল্যবোধেরও যে বিপর্যয় ঘটিয়েছিল, এই উপন্যাস তারই প্রতিফলন।
একসময় প্রবোধকুমার শুধু লেখালেখির জন্য সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তার একটাই উদ্দেশ্য ছিল যে তাতে তিনি লেখাজোকায় বেশি সময় ব্যয় করতে পারবেন। কলকাতায় এসে কিছুদিন ঘোরাফেরা করার পর সে সময়ের চলতি পত্রিকা ‘বিচিত্রা’-র সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রক হিসেবে তিনি
দ্বায়িত্ব নেন। এছাড়া বিপ্লবী বারীন ঘোষ তাঁকে ‘বিজলী’ পত্রিকার দ্বায়িত্ব দেন। সেই সুবাদে স্বদেশি আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত মানুষদের সঙ্গে প্রবোধকুমারের এক নিবিড় সংযোগ তৈরি হয়। ‘বিজলী’ পত্রিকা ছাড়াও ‘ স্বদেশ ‘,’উপাসনা ‘, ‘পদাতিক ‘, ‘ দুন্দুভি ‘ ইত্যাদি পত্রিকার সম্পাদনা করেন প্রবোধকুমার। সেইসূত্রে কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী, মোহিতলাল মজুমদার ও কবিশেখর কালিদাসের মতো গুণী সাহিত্যিকদের সঙ্গে প্রবোধকুমারের অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে। সে সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামী রামকৃষ্ণ বিশ্বাস এক পুলিশ ইন্সপেক্টরকে হত্যা করার অপরাধে তাঁর ফাঁসির হুকুম হয়। ‘ স্বদেশ ‘ পত্রিকায় সেই ঘটনার প্রতিবাদ করে সম্পাদকীয় লিখে ব্রিটিশদের রোষানলে পড়েন প্রবোধকুমার। বিশের দশক ও তিরিশের দশকের এরকম উত্তাল সামাজিক, রাজনৈতিক অনেক ঘটনাবলির সাক্ষী ছিলেন প্রবোধকুমার। সেই সব অভিজ্ঞতাই তিনি তাঁর গল্প, উপন্যাসের প্রধান বিষয় করে নিয়েছিলেন।
প্রবোধকুমারের গল্প ও উপন্যাসকে কেন্দ্র করে বহু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। যার মধ্যে – কাঁচ কাটা হীরে, পুষ্পধনু, মহাপ্রস্থানের পথে, প্রিয় বান্ধবী বিশেষ উল্লেখ যোগ্য। ‘প্রিয় বান্ধবী’র জন্য শ্রেষ্ঠ চিত্র নাট্যকারের পুরস্কারও পান তিনি। দীর্ঘদিন তিনি সাংবাদিকতাও করেছেন। ১৯৩৭ সালে ‘ যুগান্তর ‘ পত্রিকার সাহিত্য বিভাগের সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৪১ সালে সেই চাকরি ছেড়ে তিনি পুরোপুরি সাহিত্য সাধনায় নিজেকে সঁপে দেন। তারপর থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা সাহিত্যের এক অপরিহার্য লেখক।

