khuda-bakhsh-library

খুদাবক্স পাবলিক লাইব্রেরি

বিজ্ঞানী এপিজে আব্দুল বলেছিলেন, ‘একটি বই একশোটি বন্ধুর সমান। কিন্তু একজন ভালো বন্ধু পুরো একটি লাইব্রেরির সমান। ‘ সভ্যতা যত এগিয়েছে, জ্ঞান সংরক্ষণের কৌশলও তত উন্নত থেকে উন্নততর হয়েছে। সেদিক থেকে গ্রন্থাগার বা পুঁথিশালা রোজকার জীবনের একটি জীবন্ত উপকরণ। যেখানে অতীতের সব তথ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ব্যবহারের জন্য রাখা হয়। অর্থাৎ দুই প্রজন্মের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সেতু গড়ে তোলে।

ভারতের গ্রন্থাগারের ইতিহাস বহু প্রাচীন। নালন্দা এবং বিক্রমশীলা মহাবিহারের গ্রন্থাগার ছিল বিশ্ববিশ্রুত। সোমনাথ, বারাণসীতেও ছিল সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। বহু হৃদয়বান ইংরেজ তাঁদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অতীতে ছোট-বড় সংগ্রহশালা ও গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন কলকাতা, মাদ্রাজ এবং মুম্বইতে। কলকাতায় গড়ে ওঠা বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, এশিয়াটিক সোসাইটি, রামমোহন লাইব্রেরি, জাতীয় গ্রন্থাগার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি আজও সেতু রচনা করছে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের, মানুষের সঙ্গে মানুষের।

বিহারের রাজধানী পাটনার বাঁকিপুরে অবস্থিত একটি গ্রন্থাগারের কথা বলা যায় যার পুরো নাম ‘খুদাবক্স ওরিয়েন্টাল পাবলিক লাইব্রেরি’ (কেবিওপিএল)। আমরা অনেকেই এই গ্রন্থাগার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানি না। ১৮৯১ সালে পাটনায় এই লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠা করেন খান বাহাদুর খুদাবক্স খান। বর্তমানে এই গ্রন্থাগারটি ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের অধীনের আর্থিক অনুদানে চলা একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। বলাবাহুল্য, গ্রন্থাগারটি ইতিহাসবিদ, সাহিত্যপ্রেমী এবং বিদগ্ধ পন্ডিতদের উপযুক্ত জ্ঞান ভান্ডারের আকর।

প্রাচীন পুঁথিপত্র ও নথির ভান্ডার আর অমূল্য সব গ্রন্থ সংরক্ষিত আছে এই গ্রন্থাগারে। সময়ে সময়ে দেশ-বিদেশের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি পা রেখেছেন এই গ্রন্থাগারে। যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য , বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, বিজ্ঞানী সি ভি রামন, মহাত্মা গান্ধী, জর্জ নাথানিয়েল কার্জন, পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু, জ্ঞানী জৈল সিং প্রমুখ। বিশ্বের অনেক বিখ্যাত মিউজিয়ামেও এখানকার মতো দামি নথিপত্র আর গ্রন্থ দেখা যায় না। ইরাক, ইরান, মিশর, আরব ও আফগানিস্তান থেকে একটা সময় এই গ্রন্থাগারে যে সমস্ত পুস্তক সংগ্রহ করে আনা হয়েছিল তা আজও এই পুঁথিশালার অনন্য সম্পদ। প্রায় আড়াই লাখ মূল্যবান বই, বাইশ হাজার দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, চার হাজার প্রাচীন পুঁথি, পঁয়ত্রিশ হাজার পত্রিকা বুকে আগলে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের এই সেরা লাইব্রেরি। তিন হাজার অতি প্রাচীন পেইন্টিং ও চিত্র যেমন এখানকার মূল্যবান সম্পদ তেমনি পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যক্তিদের
হস্তাক্ষর এখানে সংরক্ষিত আছে। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে আছেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, কবি বাইরন প্রমুখ। দুশো’টি তালপাতার প্রাচীন পুঁথি, আরবি ও ফারসি ভাষায় লেখা কুড়িটি চামড়ার বই, তালপাতা ও ভূর্জপত্রের ওপর সংস্কৃত ভাষায় লেখা বেশ কিছু পুঁথি এখানকার
ঈর্ষণীয় সম্পদ।

বিশ্বের পয়লা নম্বর এই গ্রন্থাগারে আছে উর্দু ভাষায় লেখা ‘তারিক – এ – খানদান- এ – তৈমুরিয়া’ নামের দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থটি। একশো বত্রিশটি মনমুগ্ধকর দুর্লভ চিত্রসহ এই গ্রন্থটি তৈমুর বংশের একমাত্র আকর গ্রন্থ। এতে আছে সম্রাট জাহাঙ্গিরের নিজের হাতে লেখা কিছু নথিপত্র। আরবি, ফারসি এবং উর্দু পাণ্ডুলিপি ছাড়াও হিন্দু ধর্ম সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপি এখানে সংরক্ষিত আছে যা বিশ্বের আর কোন সংগ্রহশালায় নেই। এছাড়াও আছে পবিত্র কোরান শরিফের কিছু অতি প্রাচীন এবং রঙিন চিত্রময় কপি, জীবন চরিত, ইউনানি চিকিৎসার বই, সূফীবাদ, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব, মধ্যযুগীয় ইতিহাস, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস, পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার ইতিহাস, মধ্যযুগীয় বিজ্ঞান, জাতীয় সংহতি এবং স্বাধীনতার উপর উর্দু, ফারসি ও আরবি ভাষায় লিখিত সুবিশাল সাহিত্য ভান্ডার যা গ্রন্থাগারকে করে তুলেছে
তাৎপর্যমন্ডিত।

khuda-bakhsh

যাঁর নামে লাইব্রেরি সেই খুদাবক্স জীবন শুরু করেছিলেন একজন ‘পেশকার’ হিসেবে। তারপর হয়েছিলেন সরকারি উকিল। তিন বছরের জন্য হায়দ্রাবাদে সম্রাট নিজামের দরবারে ‘প্রধান বিচারক’ ছিলেন। সমাজসেবায় কৃতিত্বের জন্য ‘খান বাহাদূর’ উপাধি পান। সরকারী উচ্চ পদ ও সামাজিক মর্যাদা সত্ত্বেও খুদাবক্স ছিলেন সরল, নিরহংকার ও অনাড়ম্বর।
মহৎ কিছু প্রচেষ্টার জন্য তিনি সর্বদাই সচেষ্ট ছিলেন। একটা গ্রন্থাগার নির্মাণ করার ইচ্ছা তাঁর স্বপ্ন ছিল। কারণ লাইব্রেরি ছিল তাঁর ধ্যান জ্ঞান। সারাজীবন তিনি যা রোজকার করেছেন সবটুকুই ঢেলে দিয়েছিলেন এই গ্রন্থাগারের উন্নতিতে। তাই শেষজীবনে তিনি কদর্পশূন্য হয়ে পড়েন। তবুও গ্রন্থাগারকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করাই ছিল তাঁর জীবন সাধনা ।

খুদাবক্স পাবলিক লাইব্রেরির প্রাক্তন পরিচালক এবং একজন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন যে, “খুদাবক্স খান পাণ্ডুলিপি কেনার জন্য যে কোনও কিছু করতে পারতেন। তিনি বইয়ের প্রতি এতটাই আগ্রহী ছিলেন যে তার জন্য নিজের সমস্ত উপার্জন সেগুলিতে ব্যয় করতেন। সংগৃহীত বইগুলি নিজের বাড়িতেই রাখতেন এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতেন।”

ব্রিটিশ যাদুঘর একদা বেশ উচ্চ মূল্যে তার সংগৃহীত পান্ডুলিপি কেনার প্রস্তাব দিলে, তিনি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “ আমি দরিদ্র হতে পারি কিন্তু জ্ঞানের যে উত্তরাধিকার আমি প্রাপ্ত হয়েছি তা অর্থের মানদন্ডে পরিমাপ করা যায় না। এ সংগ্রহের জন্য আমি এবং আমার পিতা জীবন উৎসর্গ করেছি। আমাদের শ্রমের ফসল এ বিশাল সংগ্রহ পাটনার জনগণের জন্য উৎসর্গ করলাম।”

স্কটের ভাষায়, এই কথা বলার সময় খুদাবক্সের উজ্জ্বল ডাগর চোখ দুটি জলে ঝাপসা হয়ে আসত।
১৯৫৩ সালের ১ নভেম্বর পন্ডিত জওহরলাল নেহরু একবার এই লাইব্রেরি পরিদর্শনে এসে খাতায় লেখেন , ‘এখানে পুরোনো পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিকতম পদ্ধতির ব্যবস্থা করলে আমি আনন্দিত হব। ‘

khuda-bakhsh-library-present
খুদাবক্স পাবলিক লাইব্রেরির বর্তমান রূপ

বলা বাহুল্য, গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত হাতে লেখা পুঁথি ও পাণ্ডুলিপি কম্পিউটারে আধুনিকীকরণ করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে তা সারা বিশ্বে তা ছড়িয়ে দিয়েছে। আজও দেশ বিদেশ থেকে আগত শত
শত ছাত্র, শিক্ষক, গবেষক, তালিম এবং পর্যটকদের নিয়মিত পদধুলিতে ধন্য এই ঐতিহাসিক গ্রন্থাগার।