নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ও কাজী নজরুল ইসলাম স্মরণে কৃষ্ণনগরে দুই অগ্নিপুরুষ অনুষ্ঠান

স্মরণে নেতাজী ও নজরুল — দুই অগ্নিপুরুষ

গত ২২ আগস্ট কৃষ্ণনগর নেতাজী ভবনে বিশেষ অনুষ্ঠান ‘নেতাজী ও নজরুল — দুই অগ্নি পুরুষ’ পরিবেশিত হয়। আয়োজক সংস্থা ছায়ানট (কলকাতা) এবং কৃষ্ণনগর নেতাজী ভবন। বিশেষ সহযোগিতায় কথাশিল্প আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র।

অনুষ্ঠান শুরু হয় দুুপুর ৩টে। চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান ও কবিতা নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুকে কীভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল, সেই সম্পর্কে আলোচনা করেন ছায়ানট (কলকাতা) -র সভাপতি, বিশিষ্ট নজরুল-সঙ্গীত শিল্পী ও গবেষক সোমঋতা মল্লিক। একাধিক সভায় নেতাজী ও নজরুল উভয়ই উপস্থিত থেকেছেন , নজরুলের প্রাণমাতানো গানে অভিভূত হতেন নেতাজী। নজরুল সম্পর্কে নেতাজীর বক্তব্য এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে তুলে ধরেন সোমঋতা —
“নজরুলকে ‘বিদ্রোহী’ কবি বলা হয় এটা সত্য কথা। তাঁর অন্তরটা যে বিদ্রোহী, তা স্পষ্টই বোঝা যায়। আমরা যখন যুদ্ধে যাবো, তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে। আমরা যখন কারাগারে যাবো, তখনও তাঁর গান গাইবো।
আমি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে সর্বদাই ঘুরে বেড়াই। বিভিন্ন প্রাদেশিক ভাষার জাতীয় সঙ্গীত শুনবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কিন্তু নজরুলের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’র মতো প্রাণমাতানো গান কোথাও শুনেছি বলে মনে হয় না।
কবি নজরুল যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটা শুধু তাঁর নিজের স্বপ্ন নয় — সমগ্র বাঙালী জাতির স্বপ্ন।”

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ও কাজী নজরুল ইসলাম স্মরণে কৃষ্ণনগরে দুই অগ্নিপুরুষ অনুষ্ঠান

সোমঋতার পরিচালনায় ছায়ানট (কলকাতা)-এর শিল্পীবৃন্দ পরিবেশন করেন নেতাজীর প্রিয় নজরুল-সঙ্গীত ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘কারার ওই লৌহ কোপাট’, ‘এই শিকল পরা ছল’ সহ বেশ কয়েকটি গণজাগরণমূলক গান। কাজী নজরুল ইসলামের লেখা কবিতা ও তাঁকে নিবেদিত কবিতা আবৃত্তি করেন অম্বিকা বিশ্বাস, প্রীতিশ দত্ত, আফরিন সুলতানা, তৃষা ঘোষ, আরুশি বিশ্বাস। সুভাষচন্দ্রকে নিবেদিত কবিতা আবৃত্তি করেন ড. বৈশাখী দাস, অনঙ্গমঞ্জরী বসাক, প্রিয়াংসু কৃষ্ণ রায়, বৈদুর্য দাস, শান্তনু চ্যাটার্জী।

সুস্মিতা দত্তর পরিচালনায় সপ্তসুর-র শিল্পীবৃন্দ পরিবেশন করেন ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ এবং ‘অরুনকান্তি কে গো যোগী ভিখারী’। মাধুরী পালের পরিচালনায় সুগম সংগীত বিদ্যালয়-র শিল্পীবৃন্দ পরিবেশন করেন ‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’ এবং ‘হে পার্থ সারথী’। দেশাত্মবোধক গান ও কবিতায় মুখরিত হয় নেতাজী ভবন। দু ঘন্টাব্যাপী অনুষ্ঠানে দর্শকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন পীতম ভট্টাচার্য।

২৩ আগস্ট সাম্যবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি বিজড়িত কৃষ্ণনগরের গ্রেস কটেজে ছায়ানট (কলকাতা) এবং কথাশিল্প আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র – এর যৌথ আয়োজনে আরও একটি অনুষ্ঠান ‘আমারে দেব না ভুলিতে’ অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী পীতম ভট্টাচার্য-র পরিচালনায় সমবেতভাবে উচ্চারিত হল নজরুল রচিত শতবর্ষী কবিতা ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’। অংশগ্রহণে কথাশিল্প আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র-র ৫০ জন বাচিক শিল্পী।

স্মরণে নেতাজী ও নজরুল: কৃষ্ণনগরে দুই অগ্নিপুরুষকে শ্রদ্ধার্ঘ্য

মাহবুবুল হকের লেখা ‘নজরুল তারিখ অভিধান’ থেকে জানা যায় — “২২-২৩ মে, ১৯২৬ সালে নদিয়ার কৃষ্ণনগরে যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তের সভাপতিত্বে রাজবাড়ির নাটমন্দিরে (মহারাজ বাহাদুর হলে) বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলন পরিষদের কর্মকর্তা হিসেবে নজরুল বার্ষিক সম্মেলনের প্রস্তুতিমূলক কাজে ছিলেন সক্রিয়। সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় মর্মান্তিক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিস্থিতিতে। প্রকাশ্য ধর্মীয় মিছিলকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দাঙ্গায় বেদনাবিক্ষুব্ধ নজরুল দাঙ্গার বিরুদ্ধে দেশবাসীকে হুঁশিয়ারি আহ্বান জানিয়ে ২২ মে সম্মেলনের উদ্বোধনী সংগীত হিসেবে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ গানটি পরিবেশন করেন। তাঁকে সহযোগিতা করেন দিলীপকুমার রায় ও তাঁর সহশিল্পীরা। এই সম্মেলনকালে বা এর অব্যবহিত পরে মে মাসের মধ্যেই এখানে আরও দুটি সম্মেলন হয়। ছাত্র-সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সর্বভারতীয় কংগ্রেসের তৎকালীন সভাপতি সরোজিনী নাইডু। যুব সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ইংরেজি ফরওয়ার্ড পত্রিকার সহকারী সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। নজরুল এ তিনটি সম্মেলনের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। ছাত্র সম্মেলনে তিনি উদ্বোধনী সংগীত হিসেবে পরিবেশন করেন ‘ছাত্রদলের গান’। যুব সম্মেলনে উদ্বোধনী সংগীত হিসেবে পরিবেশন করেন ‘চল্ চল্ চল্’ গানটি।”

আলোচনামূলক অনুষ্ঠানে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক ড. দেবনারায়ণ মোদক এবং ছায়ানট (কলকাতা) – র সভাপতি, নজরুল-সঙ্গীতশিল্পী ও গবেষক সোমঋতা মল্লিক। কৃষ্ণনগরের সঙ্গে নজরুলের নিবিড় সম্পর্কের ব্যাপারে আলোকপাত করেন দুই বক্তা। কবির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এই গ্রেস কটেজ। নজরুল-স্মৃতি বিজড়িত এই গ্রেস কটেজ তাই নজরুলপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত আবেগের জায়গা। অনুষ্ঠানে দর্শকদের উপস্থিতি দেখে বোঝা যায়, কৃষ্ণনগরের মানুষ তাঁদের অন্তরে নজরুলকে কতখানি ধারণ করেন।