আবছা আলোচনায় নয়, অথেন্টিক পাঠের ওপর বঙ্কিমচন্দ্রকে দাঁড় করিয়েছিলেন ব্রজেন্দ্রনাথ ও সজনীকান্ত। পাঠবিভ্রাটের এই বাংলাদেশে সে কাজ ঐতিহাসিক। বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মদিনে লিখছেন আশিস পাঠক
ঠাকুর তোমায় কে চিনত, না চেনালে অচিন্ত্য! দীপ্তেন্দ্রকুমার সান্যাল রসিকতা করে লিখেছিলেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত প্রসঙ্গে। কারণ অচিন্ত্যকুমারের হিট বই পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ। অচিন্ত্যকুমার রামকৃষ্ণের জীবনী লিখেছিলেন। সে একরকম করে চেনানো। আর সজনীকান্ত দাস বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে যা করেছিলেন সে আর এক রকম করে চেনানো। পাঠবিভ্রাটের এই বাংলাদেশে অতি জনপ্রিয় এক কথাসাহিত্যিকের অথেন্টিক পাঠ সামনের প্রজন্মের জন্য ধরে রাখা, তারা যাতে তাঁকে চিনতে ভুল না করে। আজ, বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মদিনে ‘শনিবারের চিঠি’র খ্যাতনামা সম্পাদক সজনীকান্ত দাসের সেই আর এক পরিচয় ফিরে দেখাই যায়।

উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্য, বিশেষ করে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আকর গ্রন্থসমৃদ্ধ কাজ করেছেন সজনীকান্ত দাস। কেবল বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যমূল্যায়নই নয়, বরং বঙ্কিম-সাহিত্যের পাঠোদ্ধার ও প্রামাণ্য রূপটি পাঠকের সামনে তুলে ধরায় সজনীকান্তের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। সেই ভূমিকাকে এই ভাবে দেখা যায়। বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে সজনীকান্ত দাসের সবচেয়ে বড় অবদান একক লেখার চেয়েও তাঁর নিখুঁত ও গবেষণামূলক সম্পাদনার মধ্যে নিহিত। বিখ্যাত গবেষক ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি বঙ্কিম-চর্চায় বিপ্লব এনেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মশতবর্ষ (১৯৩৮) উপলক্ষে বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষদ থেকে বঙ্কিমচন্দ্রের সমস্ত রচনার যে প্রামাণ্য সংস্করণ প্রকাশিত হয়, তার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনীকান্ত দাস।

বঙ্কিমচন্দ্র জীবদ্দশায় তাঁর উপন্যাসের বহু পরিবর্তন ও পরিমার্জন করেছিলেন। সজনীকান্ত দাস প্রতিটি উপন্যাসের আদি পাঠ এবং পরবর্তী সংস্করণের পাঠভেদ সুনিপুণভাবে তুলনা করে এই সংস্করণে যুক্ত করেন, যা বঙ্কিম-চর্চার ইতিহাসে একটি মাইলফলক। বঙ্কিমচন্দ্রের বিভিন্ন সময়ে লেখা চিঠিপত্র উদ্ধার, সেগুলির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ এবং তা সংকলন করার পেছনে সজনীকান্ত দাসের বড় ভূমিকা ছিল। সজনীকান্ত দাস সম্পাদিত বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা ‘শনিবারের চিঠি’-র পাতায় পাতায় বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যাদর্শের জয়গান গাওয়া হয়েছে। রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগের কল্লোল বা প্রগতিপন্থী লেখকদের ‘অতি-আধুনিকতা’ ও শ্লীলতা-অশ্লীলতার বিতর্কের জবাবে সজনীকান্ত প্রায়শই বঙ্কিমচন্দ্রের ধ্রুপদী সাহিত্যবোধ, সংযম এবং নৈতিকতার উদাহরণ টেনে সম্পাদকীয় ও প্রবন্ধ লিখতেন। বঙ্কিমচন্দ্রের দেশাত্মবোধ, ‘বন্দে মাতরম্’ মন্ত্রের তাৎপর্য এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ গঠনে বঙ্কিমচন্দ্রের ভূমিকা নিয়ে তিনি ‘শনিবারের চিঠি’র বিভিন্ন সংখ্যায় আলোচনা করেছেন। ঠিক এই বিষয়টির প্রসঙ্গে একটু পড়া যাক তাঁর আত্মস্মৃতি থেকে ‘রাজসিংহে’র মহিমা আজও অটল হইয়া আমার মনে বিরাজ করিতেছে। পরবর্তী জীবনে বহু গল্প-উপন্যাসে মহৎ ত্যাগের বহু আদর্শকে জয়যুক্ত হইতে দেখিয়াছি, কিন্তু ‘রাজসিংহে’র আদর্শ তুলনায় স্নান না হইয়া দিনে দিনে উজ্জ্বলতর হইয়াছে। ইহার কারণ, বঙ্কিমচন্দ্র স্বদেশী-আন্দোলনের পূর্বগামী হইলেও আমি উক্ত আন্দোলনের চরমতম সংঘাতের মধ্যে উপন্যাসখানি পাঠ করিয়াছিলাম। আমার মনে মোগলে এবং ইংরেজে একাকার হইয়া গিয়াছিল, স্বদেশী-যজ্ঞের হোতারা রাজসিংহ-মাণিকলালের স্থলাভিষিক্ত হইয়াছিলেন।’…
সজনীকান্ত দাসের বঙ্কিম-সংক্রান্ত লেখার মূল সুরটি ছিল মূলত দুটি ধারায় বিভক্ত:
১. পাঠ-সমীক্ষা ও শুদ্ধতা (Textual Criticism): সজনীকান্ত বিশ্বাস করতেন, কোনো লেখকের সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব নয় যদি না তাঁর লেখার আদি ও খাঁটি পাঠটি জানা যায়। তাই তিনি বঙ্কিম-সাহিত্যের কমা, সেমিকোলন থেকে শুরু করে শব্দের পরিবর্তন পর্যন্ত অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে লিপিবদ্ধ করেছেন।
২. ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পুনরুত্থান: সজনীকান্ত বঙ্কিমচন্দ্রকে কেবল একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে দেখেননি; তিনি বঙ্কিমকে দেখেছিলেন আধুনিক বাঙালি সংস্কৃতির ও চিন্তাধারার প্রধান নির্মাতা বা ‘ঋষি’ হিসেবে।
সজনীকান্ত দাসের সম্পাদনা কেবল মুদ্রণ তদারকি ছিল না; এটি ছিল উচ্চমানের টেক্সচুয়াল ক্রিটিসিজম (Textual Criticism) বা পাঠ-সম্পাদনা। সজনীকান্ত দাস যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন, তা বাংলা প্রকাশনা জগতে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছিল:
আদি পাঠের সন্ধান: সজনীকান্ত প্রতিটি উপন্যাসের প্রথম সংস্করণ এবং বঙ্গদর্শন বা অন্য পত্রিকায় প্রকাশিত আদি রূপটি সংগ্রহ করেন।
পাঠান্তরের চুলচেরা বিশ্লেষণ: বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর জীবদ্দশায় কোনও উপন্যাসের পাঁচ বা ছটি সংস্করণ নিজে সংশোধন করেছিলেন। সজনীকান্ত সেই প্রতিটি সংস্করণের অমিল বা ‘variants’ খুঁজে বের করেন। কোন সংস্করণে বঙ্কিম কোন শব্দটি বাদ দিলেন, কোন নতুন বাক্য যোগ করলেন, তা সজনীকান্ত দাস ও ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংস্করণে নিখুঁতভাবে পাদটীকায় ধরে রাখা হল।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে সজনীকান্ত দাসের সম্পাদনায় প্রকাশিত উপন্যাসগুলো তাই কেবল সাধারণ পাঠকের পড়ার বই নয়, তা হল বঙ্কিম-চর্চার আকর গ্রন্থ। আজ যদি কেউ বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের ওপর উচ্চতর গবেষণা করতে চান, তবে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনীকান্ত দাসের সম্পাদিত সংস্করণের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া তাঁর কোনো গতি নেই।

