durga-puja-new-dress-poor-child-story-bengali

মুনিয়ার পুজোর জামা

গড়িয়াহাটের পুজোর বাজারটা এখন আর তেমন জমে না। বছর ক’য়েক আগেও পুজোর বাজারটা এখানকার ব্যাপারীদের সারা বছরের পুঁজির একটা নিশ্চিত আর নিশ্চিন্ত ভরসার জায়গা ছিল। শ্রাবণ মাস পড়তেই ভিড়ে জমজমাট হয়ে উঠত এই গড়িয়াহাট মার্কেট। ফুটপাতের ওপর দোকানগুলোতে ঢালাও বিক্রি হত হরেক স্টাইলের শার্ট, জামাকাপড়, জুতো, জুয়েলারি, বেডকভার, কাপ-ডিশ, ঘর সাজাবার জিনিস এমনকী বউ ঠাকুরাণির হাটের আর্টিফিসিয়াল প্ল্যান্ট-ফ্লাওয়ার ইত্যাদি। গড়িয়াহাটের পুজোর মার্কেটের টানে কলকাতার উত্তর-দক্ষিণ একাকার হয়ে যেত।

শুধু যে ব্যবসায়ীদেরই উপার্জন হত, এমনটা নয়। পুজোর বাজার সেরে বাড়ি ফেরার জন্য গড়িয়াহাটের ট্যাক্সিওয়ালাদেরও রোজগার ভালোই হত। কারণ দু’হাত ভর্তি করে পুজোর বাজার সেরে ভিড় বাসে চেপে বাড়ি ফেরা অসম্ভব ছিল। অগত্যা ট্যাক্সি ছাড়া বাড়ি ফেরার উপায় ছিল না। পুজোর মার্কেটিং সেরে হাঁপাতে হাঁপাতে মা জননীরা ট্যাক্সির দরজা খুলে প্রায় গোত্তা খেয়ে ঢুকে যেতেন ট্যাক্সির মধ্যে। আর কর্তামশাইরা তখন ব্যস্ত হয়ে পড়তেন মিটারের কারসাজি কিছু আছে কিনা পরীক্ষা করতে। তারপর ট্যাক্সির মধ্যেই চলত পুজোর বাজারের লাভ লোকসান নিয়ে আলোচনা।

দেখতে দেখতে সময় বদলাল। শপিং মল-এর জমানায় বছরভর নানান ডিসকাউন্ট। হাতে সময় কম থাকলে অনলাইন শপিং তো আছেই। সেই সঙ্গে পাড়ায় পাড়ায় বুটিক। কাজেই ঘুরে ঘুরে পুজো মার্কেটিং এখন আর পোষায় না। বিশেষ করে এই প্রজন্মের জেন জি’দের তো নয়ই। তবু এখনও যাঁরা ফুটপাথ ঘেঁসা ওপেন মার্কেটে আসেন, সে হয় নিয়মরক্ষার খাতিরে নয়তো নস্ট্যালজিয়ার টানে।

একইভাবে বাড়ি ফেরার জন্য হলুদ ট্যাক্সিওয়ালারাও এখন প্রায় ব্রাত্য। ওলা, উবের, ইনড্রাইভ-এর মতো অ্যাপ ক্যাবদেরই রমরমা আজকের দিনে।তাদের পাশে হলুদ ট্যাক্সি এখন দুয়োরানির মতো। রাত একটু বেশি গড়িয়ে গেলে, যখন অ্যাপ ক্যাবগুলোর চার্জ একটু বেশি বাড়তে থাকে, তখন হলুদ ট্যাক্সির খোঁজ করেন ছাপোষা মাঝারি মাপের মধ্যবিত্তরা।

তবে এবার গড়িয়াহাটের ট্যাক্সি ড্রাইভার রামদীনের ভাগ্যটা বোধহয় সুপ্রসন্ন ছিল। প্রায় তিরিশ বছর ধরে এই ট্যাক্সি চালাচ্ছে রামদীন। এই হলুদ ট্যাক্সিটা তার বাবা দাশরথির আমলে কেনা হয়েছিল অনেক ধারকর্জ করে। এই শহরে রামদীনের ট্যাক্সি চালানো শেখা বাবার কাছ থেকেই।

শ্রাবণ মাসের শেষের দিক। বর্ষা তো বিদায় নেয়ইনি। তার ওপরে যখন তখন নিম্নচাপের উপুরঝুপুর বৃষ্টি।বাসগুলোতে ঠাসাঠাসি ভিড়। ওদিকে রাত প্রায় দশটা বাজতে যায় । রোজকার মতো রামদীন তার হলুদ ট্যাক্সি নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে গড়িয়াহাটের ফুটপাত ঘেঁষে। দুজন মহিলা রামদীনকে জিজ্ঞেস করলেন গিরিশ পার্ক শেয়ারে যাবে কিনা। রামদীন মনে মনে ভাবল, এখন এমনিই ট্যাক্সির ভাড়া হয় না। তায় আবার এত রাতে শাটলের বায়না! মনে মনে বিরক্ত হলেও মুখে অবশ্য সেকথা বলল না রামদীন। উল্টে বলল, অপেক্ষা করুন, দেখুন, যদি একইপথের যাত্রী কেউ হয়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক, তাঁর স্ত্রী আর বছর আটেকের একটা মেয়েকে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলেন রামদীনের ট্যাক্সির দিকে। তাঁরা যাবেন উত্তর কলকাতার শোভাবাজার। রামদীন দেখল ভালোই হল। তার বাড়ি শ্যামবাজারের কাছে খালপাড় বস্তিতে। বাড়ি ফেরার পথে এঁদের নামিয়ে দিতে পারবে। আজ সারাদিন মাত্র দুটো ট্রিপ হয়েছে। শেষ বেলায় চারজন সওয়ারী পেয়ে ভালোই হল। মহিলা তিনজন পেছনে বসলেন। আর ভদ্রলোকটি তাঁর ছোট্ট মেয়েটিকে কোলে নিয়ে সামনের সিটে বসলেন। রামদীন দেখল, ভদ্রলোকের স্ত্রীটি বেশ অল্পবয়সী। মেয়েটিও ছোট। বোধহয় একটু বেশি বয়সেই মেয়েটা হয়েছে। রামদীনের নিজের মেয়েটাও তো ঠাকুরের কাছে মানত টানত করে অনেকদিন পরে জন্মেছে। সেই মেয়ে নয়নের মণি রামদীনের।

আজ রাস্তায় খুব জ্যাম। আর বৃষ্টির পরে ভ্যাপসা গরমও পড়েছে। বাচ্চা মেয়েটা ট্যাক্সির সামনে বসে ছটপট করছে। দু-তিনবার তার নরম পা রামদীনের গায়ে এসে লাগল। ভদ্রলোক মেয়েকে মৃদু বকুনি দিয়ে তার পা সরিয়ে দিলেন। রামদীন বলল, থাক, থাক, ও কিছু হবে না। আমার ঘরেও ওর মতো একটা ছোট মেয়ে আছে।আসলে ওর নরম পায়ের স্পর্শ রামদীনের ভালোই লাগছিল।

রামদীনের বাবা দাশরথি সেই কবে বিহার ছেড়ে বাংলায় চলে এসেছিল। প্রথমে একজন ডাক্তারের গাড়ি চালাত। পরে ডাক্তারবাবু হটাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে দাশরথির ড্রাইভারির চাকরিতে ছুটি হয়ে যায়। রামদীন তখন খুব ছোট। ডাক্তারবাবু মানুষটা ভালো ছিলেন। তিনি রামদীনের বাবাকে বেশ কিছু টাকা ধার দিয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে এই হলুদ ট্যাক্সিটা কিনেছিল বাবা। রামদীনের মা ছিল বাঙালি। বাড়িতে বসে ঠোঙা বানানোর কাজ করত। সবাই মিলে কষ্ট করে সংসারটা চালিয়ে দিত।

দাশরথি রামদীনকে করপোরেশনের একটা স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল। কিন্তু বাবা অুসস্থ হয়ে পড়ায়, রামদীন বেশিদিন এগোতে পারেনি পড়াশুনো। তারপর সে এই শহরে ট্যাক্সি চালানো শুরু করেছিল পেট চালাতে। পয়সাকড়ি একটু জমতে বিয়ে করল রামদীন। সংসার পাতল বাবার আমলের বাসস্থান, উত্তর কলকাতার ওই খালপাড়ের বস্তিতেই। সারাদিনের ড্রাইভারি শেষ হলে বস্তির একপাশের ফাঁকা জায়গাতে সে তার ট্যাক্সিটা রাখে। বস্তির লোকেদের মধ্যে কেউ কেউ এজন্য আপত্তি জানালেও সেকথা ধোপে টেকেনি। কারণ, রাতবিরেতে বস্তির কারও অসুখ করলে রামদীনের এই ট্যাক্সিটাই ভরসা। তাছাড়া আরও একটা কারণে রামদীনের একটু কদরও রয়েছে ওই বস্তিতে।

আসলে, রামদীনের বাবা দাশরথি ছিলেন একজন সৎ মানুষ।একবার তাঁর ট্যাক্সিতে কেউ একজন টাকার বান্ডিল ফেলে গিয়েছিল। রামদীনকে সঙ্গে করে নিয়ে দাশরথি সেই টাকা থানায় জমা করে এসেছিলেন। পরে থানা থেকে যোগাযোগ করে টাকার মালিককে সেই টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছিল। টাকার মালিক সেই ভদ্রলোক, পরে রামদীনের ঠিকানা জোগাড় করে খালপাড় বস্তিতে এসেছিলেন।সততার পুরস্কার হিসেবে রামদীনের বাবাকে কিছু টাকা উপহারও দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দাশরথি তা নেননি। হাতজোড় করে মাফ চেয়ে ফেরত দিয়েছিলেন। এই খবরটা সেইসময় একটা দৈনিক কাগজে ছাপা হয়েছিল। রামদীনের স্কুলের হেডমাস্টারমশাই সেই খবরটা ক্লাসে পড়ে শুনিয়েছিলেন। রামদীনের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, বড় হয়ে যে কাজই করো, বাবার মতো সৎ মানুষ হোয়ো।

সেসব দিন কবে কেটে গিয়েছে। রামদীন এখন এই হলুদ ট্যাক্সি চালিয়ে কোনওরকমে দিন গুজরান করছে। একসময় ভালোই উপায় করত। এখন টানাটানির সংসারে রাত্রিদিন বউয়ের সঙ্গে খিটিমিটি লেগে থাকে। বাবার এই টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার গল্পটা বউকে শোনালে সে বলে, ওই সততা ধুয়েই জল খাও। সত্যি বউটার কাছে কোনও দামই নেই রামদীনের। একমাত্র মেয়ে মুনিয়াটাই তার জান। কিন্তু তাকেও তো অভাবের জন্য ভালোমন্দ কিছু কিনে দিতে পারে না রামদীন।

…সওয়ারী ভদ্রলোক তাঁর মেয়েটার জন্য নতুন জামাকাপড় কিনেছেন। সেই আনন্দে মশগুল ছিল মেয়েটা। স্কুলের বন্ধু, মিন্টুমাসী, ঠাম্মি, দাদুভাই — আরও কাকে কাকে জামাটা দেখাবে, কলকল করে সেসব গল্প করছিল। ট্যাক্সি চালাতে চালাতে রামদীন কান খাড়া করে সেসব শুনছিল। রামদীনের মনে পড়ে যাচ্ছিল ওর মেয়ে মুনিয়ার মুখটা।ট্যাক্সিটা গিরিশ পার্ক ছাড়িয়েই চলে যাচ্ছিল। দিদিমণিরা চিৎকার করে উঠে গাড়ি থামাতে বললেন। তারপর রামদীনের হিসেবমতো ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে চলে গেলেন।

এরপর শোভাবাজার আসতেই শেষ সওয়ারী ভদ্রলোক স্ত্রী-মেয়ে আর প্যাকেটপত্র নিয়ে ট্যাক্সি থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে দিলেন। ভদ্রলোকের ছোট মেয়েটা টা টা করল রামদীনকে। ভারী ভালো লাগল ওর। আজকের যুগে ট্যাক্সি ড্রাইভারকে কে আর সম্মান করে! কিন্তু এই পরিবারটা ভালো।

রাত প্রায় পৌনে বারোটা। একটা প্যাসেঞ্জার পার্টিকে কালীঘাটের মন্দিরে নিয়ে যেতে হবে। ভালো টাকাতেই রফা হয়েছে। রোজকার মতো ট্যাক্সিটাকে গলির মোড়ে রেখে দরজা লক করে বাড়িতে ঢুকতে যাবে রামদীন। হটাৎ দেখল পেছনের সিটে একটা ব্রাউন প্যাকেট পড়ে রয়েছে। মনে তো হচ্ছে জামাকাপড়েরই হবে। প্যাকেটটা স্টেপলার দিয়ে আটকানো। মানে ফুটপাতের কেনা জিনিস নয়।

কিন্ত কে ফেলে গেল? সওয়ারীরা তো সবাই গড়িয়াহাট থেকেই উঠেছিলেন। পেছনে তো তিনজন ভদ্রমহিলা বসেছিলেন। তাদের মধ্যে কার হবে প্যাকেটটা? সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে প্যাকেটটা ঘরে নিয়ে গেল রামদীন। রোজকার মতো বউ খাবার ঢাকা দিয়ে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাকে অনেক সকালে উঠে কাজে বেরোতে হয়। রঙের মিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করে সে।

রামদীন প্যাকেটটা ঘরে নিয়ে গিয়ে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগের মধ্যে রেখে দিল। যাতে কারও চোখে না পড়ে, এমনভাবে। মুখ হাত ধুয়ে ঠাণ্ডা কড়কড়ে ভাতগুলো একটু ডাল আর আলু চোখা দিয়ে খেতে খেতে ভাবতে লাগল। কাল কালীঘাট থেকে ফিরে ওই মুখবন্ধ প্যাকেটটা খুলে দেখবে। প্যাকেটটা যারই হোক তারা সম্ভবত গড়িয়াহাট থেকেই মার্কেটিং করেছে।কারণ কালকের সওয়ারিরা তো সবাই ওখান থেকেই উঠেছিল। প্যাকেটের ভেতর নিশ্চয় রসিদ থাকবে। আর রসিদে নিশ্চয়ই দোকানের নামও থাকবে। এতদিন ওই অঞ্চলে ড্রাইভারি করছে রামদীন।গড়িয়াহাটের দোকানটা খুঁজে পেতে ওর অসুবিধে হবে না। কাল সন্ধেতেই গড়িয়াহাটে দোকানটায় গিয়ে প্যাকেটটা ফেরত দিয়ে আসবে। আর এখন তো দোকানে রসিদের কাউন্টার পার্টে ক্রেতাদের ফোন নম্বরও লেখা থাকে। সেখান থেকে যাঁর কেনা জিনিস, তাঁকে খুঁজে পেতে অসুবিধে হবে না।

খাওয়ার পরে বিছানায় শুতে যাওয়ার আগে এসব কথাই রামদীন ভাবতে লাগল। বাবার মতো সেও তো অন্যের জিনিস ফেরত দিয়ে দিচ্ছে। এটাও তো তার সততারই পরিচয়! এজন্য হয়তো কোথাও তার নাম ছাপা হবে না।

মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিল। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই রামদীন ট্যাক্সি নিয়ে বেরিয়ে গেল। চা নাহয় রাস্তাতেই খেয়ে নেবে। যাওয়ার আগে ঘরে আরেকবার দেখে গেল প্যাকেটটা ঠিকমতো লুকনো জায়গাতে আছে কিনা? যাঁরা কালীঘাটে গিয়েছিলেন, তাঁরা প্রসাদ বলে কিছু মিষ্টিও দিয়েছেন রামদীনকে। বিকেলের আগেই বাড়ি ফিরে এল রামদীন। অন্য সময় হলে আর বেরতো না। কিন্তু প্যাকেটটা যে আজকেই তাকে গড়িয়াহাটের দোকানে ফেরত দিতে হবে।

তখনও গোধূলির লাল আলো ছড়ায়নি আকাশে। আশেপাশে কোথাও মাইকে গান বাজছে। ছোটদের নিয়ে ফাংশান হচ্ছে কাছেপিঠে কোথাও। রামদীনকে গলি থেকে একটু দূরেই রাখল তার ট্যাক্সিটা। একটু পরেই তো তাকে আবার গড়িয়াহাট বেরোতে হবে প্যাকেটটা ফেরত দিতে।
ঘরে ঢোকার আগেই, মুনিয়া তাকে দেখে আনন্দে ছুটতে ছুটতে আসতে লাগল। পাপা… পাপা… ডাক দিয়ে। আসলে অন্যদিন তো রামদীনের বাড়ি ফেরার সময়ে ও ঘুমিয়ে পড়ে।আজ বিকেলে বাবাকে দেখে খুব খুশি মুনিয়া।

আনন্দে মুনিয়া যেন হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে আসছে। রামদীন দেখল, তার গায়ে একটা দামি নতুন জামা। তলার দিকটা ঢেউ খেলানো অনেকগুলো কাপড়ের ফ্রিল দেওয়া, নীল রঙের। বুকের কাছে সাদা জায়গায় একটা রঙবেরঙের কাপড়ের প্রজাপতি বো করে আটকানো। মুনিয়া যখন তার দিকে ছুটে আসছিল, মনে হচ্ছিল একটা প্রজাপতি যেন ডানা মেলে আসছে।

মুহূর্তের মধ্যে রামদীনের মাথাটা ঘুরে গেল। এই জামা মুনিয়াকে কে দিল? এত দামি জামা কেনা তো তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। রামদীন ঘরে ঢুকে আঁতিপাতি করে খুঁজতে লাগল সেই প্যাকেটটা। নাঃ, কোত্থাও নেই প্যাকেটটা। শুধু রসিদটা আধছেঁড়া হয়ে পড়ে রয়েছে। রাগে রামদীনের মাথায় আগুন ছুটতে লাগল।
চেঁচামেচি শুনে বউ বলল, ঘর গুছোতে গিয়ে সে ওই নতুন জামার প্যাকেটটা পেয়েছে। এবার আয় ভালো না হওয়ায় পুজোয় এবার মুনিয়াটার নতুন জামা হবে কিনা সন্দেহ । এই জামাটা দেখে মনে হল ভগবানই ওপর থেকে পাঠিয়েছে। আর মুনিয়াও নতুন জামাটা দেখে কান্না জুড়েছিল পরার জন্য।তাই…

রেগে অগ্নিশর্মা রামদীন বলল, আরে এই নতুন জামার প্যাকেট তো কেউ ভুল করে তার ট্যাক্সিতে ফেলে গিয়েছে। আজকেই তো ওই প্যাকেটের ভেতর রসিদ দেখে দোকানে জামাটা ফেরত দেওয়ার জন্য বেরোচ্ছে সে। যাতে যাদের জিনিস খোয়া গিয়েছে, তাদের সঙ্গে দোকান থেকে আজকেই যোগাযোগ হয় প্যাকেটটা ফেরত দিতে।এর মধ্যেই এই কাণ্ড!

রাগে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে রামদীন মুনিয়ার গা থেকে জামাটা জোর করে খুলে নিতে গেল। মেয়েটা বোধহয় বেশিক্ষণ পরেওনি জামাটা। মুনিয়া কিছুতেই জামাটা খুলতে দেবে না। জোর করে জামাটা মুঠো করে আঁকড়ে ধরে রাখতে গেল। কিন্তু বাবার সঙ্গে গায়ের জোরে পারবে কেন?
রামদীন মেয়ের কাছ থেকে জামাটা কেড়ে নিয়ে ঝেড়েঝুড়ে প্যাকেটবন্দি করে বাইরে বেরোল। পেছন থেকে ভেসে আসছে মুনিয়ার কান্না – আমার নতুন জামা…।

তারস্বরে বউ চেঁচাচ্ছে — যাদের জামা ফেরত দিতে যাচ্ছ, তারা এরকম হাজারটা জামা মেয়েকে কিনে দিতে পারে। আর মেয়েটা একটা কুড়িয়ে পাওয়া নতুন জামা পরেছিল, সেটা খুলে নিলে! মেয়েটার কান্না দেখেও মন ভিজল না। কেমন বাবা তুমি? নিজের বাবা না সত বাবা?

রামদীন ততক্ষণে ট্যাক্সিতে স্টার্ট দিয়েছে। প্যাকেটটা সামনের সিটেই রেখেছে। আজকে আর কোনও সওয়ারী নেবে না সে।কানে বাজছিল বউয়ের চিৎকার, মেয়ের কান্না, বাবার কথা – সবকিছু। সব কিছু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল রামদীনের। তবে কি সৎ হতে গিয়ে, সে নিজের মেয়েরই সত বাবা হয়ে গেল!

গড়িয়াহাটে পৌঁছে দোকানটা খুঁজে পেতে বিশেষ বেগ পেতে হল না রামদীনের । আজ ওখানে খুব ভিড়। দোকানের এক কর্মচারীকে একপাশে ডেকে পুরো ঘটনাটা বলে প্যাকেটটা ফেরত দিল রামদীন। অনুরোধ করল, রসিদ থেকে ভদ্রলোকের ফোন নম্বর নিয়ে তখুনি ফোন করতে। হারিয়ে যাওয়া জিনিস ফিরে পেলে নিশ্চয়ই খুশি হবেন তাঁরা।

দোকানের কর্মচারী ফোন করতেই ওপার থেকে একটা ভারী গলা শুনতে পেল। আর শুনতে পেল একটা কচি গলার আনন্দের চিৎকার। বাবা আমার জামা…

রামদীনের কানে বাজতে লাগল মুনিয়ার কান্না। ও আর অপেক্ষা করল না। ট্যাক্সিটা নিয়ে বাড়ির পথ ধরল। সাড়ে আটটার মধ্যে বাড়ি ফিরতে পারলে, মুনিয়াকে নিয়ে বেরোতে পারবে। নিজের হাতে একটা নতুন জামা কিনে দেবে মেয়েকে।

রাত বেশি হয়নি। বউ রান্নাঘরের কাজ সারছে। রামদীন যে ফিরেছে, টেরও পায়নি। ঘরে ছোট আলোটা জ্বলছে। রামদীন দেখল, কাঁদতে কাঁদতে অসময়ে ঘুমিয়ে পড়েছে মেয়েটা। চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে তার কচি গালে। মেয়ের মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করতে গিয়ে রামদীন দেখল, ঘুমন্ত মেয়ের আলগা হওয়া মুঠিটায় ধরা রয়েছে কাপড়ের একটা প্রজাপতি। জোর করে মুনিয়ার গা থেকে ওই নতুন জামাটা খোলবার সময়ে প্রজাপতিটা রয়ে গিয়েছে ওর মুঠোয়।

মুনিয়াকে নতুন জামা কিনে দেওয়ার ইচ্ছেটাই বোধহয় রামদীনের অপত্যস্নেহের সুতো ছিঁড়ে মুনিয়ার হাতে ধরা দিয়েছে প্রজাপতি হয়ে। ওটাই বোধহয় মেয়েকে দেওয়া রামদীনের পুজোর উপহার !!!