রাত আটটার পর ঝড় উঠেছিল। তুমুল ঝড়। গাছগুলো সারা শরীর দিয়ে যেন তাণ্ডব নৃত্য। ভালোবাসার চরম মুহূর্তে যেমন শরীর কষ্ট পেতে ভালোবাসে, গাছও তেমন পাগল হয়ে যায় ঝড়কে পেলে। ভেঙ্গে যায়, দুমড়ে মুচড়ে যায়। আশ্লেষ থামে না। গাছের নিচে ঝরে পড়া কচি আমের গন্ধ। ভিজে মাটির গন্ধ নিয়ে এল বৃষ্টি। রিসর্ট থেকে দু হাত ছড়িয়ে দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল দুই বন্ধু। শরীর আর মন জুড়ে কালবৈশাখীর দাপাদাপি। প্রথম যৌবনের মতোই সেই ভালোলাগা।
হওয়ার কথাই ছিল। বোলপুর স্টেশনে যখন নামল দুপুর একটা। তীব্র দহনবেলা। রিসর্ট পৌঁছে ঠাণ্ডা বিয়ারের খোঁজ। অবশ্য চিরকালই এমনটা হয়। রবির জন্মমাস। এমন চাঁদিফাটা গরমে সাধুমানুষটা অশ্বত্থ গাছের নিচে বসে গান বাঁধতেন। তপ্ত বাতাসে ফর্সা শরীর লাল হয়ে যেত। পুরনো লোকেরা বলেন – অমনটা নয়। তখন এত গরম পড়ত না। এ সি ছিল না তাই অসহ্য ছিল না।
বললেই হল? বীরভূমটা ওই ইয়ে মানে কর্কটক্রান্তির বরাবর না?
ভোর পাঁচটায় ওরা পৌঁছে গেল গৌরপ্রাঙ্গনে। বৈতালিকের আসর। ভালোলাগা খুঁজতে গিয়ে সাতসমুদ্র তেরো নদী পার। আসলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এখানে ওখানে। কুড়িয়ে নিলেই হয়। যত্নে। আদরে। পায়ে পায়ে সবাই উপাসনাগৃহের পথে। মাঝে একটু থামা সুবলের চায়ের দোকানে। সকাল বিকেলে চা বিস্কুট মুড়ি ঘুগনি আর বাকি সময় কুমোরের চাক। সুবলের টেরাকোটা ‘আমার কুঠি’তে বিক্রি হয়। কিছু মানুষ আছে এখনও। সময় আর রৌপ্যমুদ্রার ছোঁয়ার বাইরে। নিজের তৈরি মাটির ভাঁড়েই সুবলের চা। এই পুরো পথটা বিকেল হলেই বর্ষবরণ সরণী। নতুন বছরের মেলা। হরেক খাবার। হস্তশিল্প। বাবা মায়ের আর দাদু দিদার কোলে কাঁখে আন্ডা বাচ্চা। পোলাপান। অনেক বছর ধরেই আসা। স্মৃতির ভাঁড়ারে কাটুম কুটুম।
নয়টা বাজে প্রায়। ঘণ্টাতলায় নাচ গান নাটক কবিতা আর রবীন্দ্রনাথে ডুবে থাকার ক’ ঘণ্টা। দেখা হয়ে গেল অনাদি সরকারের সঙ্গে। প্রায় বছর আট পর। কারুশিল্পের প্রফেসর। শমীকের সঙ্গে আলাপ এসপারান্তর দৌলতে। আন্তর্জাতিক ভাষার সেই ঢেউয়ে ভেসে যাওয়া। সে সব কবেকার কথা। দাড়িগোঁফের জঙ্গলমহল। ডাকাতে বাবরি চুল। কিন্তু ভালো মানুষ। সরল সাদাসিধে আন্তরিক। ‘কোনও কথা শুনবো না। আজ দুপুরে আমার বাড়িতে ডালভাত। বন্ধুকে নিয়ে অবশ্যই।’ নির্ঝর ঘাড় নাড়ে। সম্মতি। অগত্যা।
আকাশে ইতিউতি মেঘের দর্শন। গরমটা আজ কম। কী আশ্চর্য। শমীক আর নির্ঝর আশ্রমপাড়া পৌঁছল দেড়টা নাগাদ। আম্রকুঞ্জ হাতছোঁয়া দূরে। ছিমছাম একতলা বাড়ি। বাগান। ছড়িয়ে ছিটিয়ে। উঠোনে কংক্রিটের তিন চারটে ভাস্কর্য। অনাদিবাবু, দুর্গাপ্রতিমা ওঁর স্ত্রী আর দুই মেয়ে। মায়ের জুনিয়র কপি দুজনেই। ডাবের শাঁস ভাসানো শরবত। উফফ। কী মিষ্টি জল। দু’চার কথা। অ্যালবামের পাতা উল্টোনো। রামকিঙ্কর। খাওয়ার পর্ব মাঝের ঘরে। টেরাকোটা ঘর। মেঝে থেকে সিলিং। মুগ্ধ হতে কতটুকু চাই? একটা মন আর সামান্য উপকরণ।
‘গুরুদেব বৈশাখ মাসের প্রেমে আজীবন। পঁচিশে বৈশাখ নয়। পয়লা বৈশাখ জন্মদিন পালন করতেন। এখনও উৎসব। উপলক্ষ তাই। আসলে উনি একটা বিশাল চুম্বকের মতো । সেই আকর্ষণ। সেই উন্মাদপ্রকৃতি । মহাজাগতিক বিশাল এক ছাতা।’

মেঝেতে বিন্যস্ত কুরুশের আসন। পাতের পাশে লেবু নুন কাঁচালঙ্কা। দুই বোন পরিবেশনে। ফুলকো লুচি, গোল বেগুনভাজা আর আলু দিয়ে ছোলার ডাল। চমৎকার। গল্প আর খাওয়া পাল্লা দিয়ে। বৌদি ত্রিপুরার মেয়ে। বিশ্বভারতীতে পড়তে এসে কালক্রমে এখানেই। এক একজনের খাওয়া খুউব গোছানো। তিন আঙুলে লুচি ছিঁড়ে ডাল বা বেগুনভাজার সাহচর্যে খাওয়া। খাওয়াটাও একটা শিল্প। দেখলে মনে হয়, একটু খাই। বসে পড়ি। অনাদিবাবুর খাওয়া ওইরকম। লম্বা, ফর্সা আঙুল। এরপর সাদা ভাত। মাটন। শেষ পাতে কাঁচা আমের চাটনী। সর্বমঙ্গলার মিষ্টি দই। এক সম্পূর্ণ বাংলা নববর্ষের ভোজ। গল্প করতে করতে ওনারা খেতে থাকুন আর আমরা দেখি এই ভোজের আয়োজন।
ছোলার ডাল আগের রাতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। ভালো করে ধুয়ে নিয়ে অবশ্যই। প্রেসার কুকারে পরিমাণমত নুন হলুদ আর একটু তেল। জল দিয়ে আগুনে। দুটো সিটি। একটা বড় আলু ডুমো করে কেটে নিন। কড়ায় ঝাঁঝালো কাচ্চি ঘানি সর্ষে তেল। দুটো শুকনো লঙ্কা আর জিরে ফোড়ন। দুধে মিশিয়ে একটু হিং। আদা আর কাঁচা লঙ্কা বাটা। আলু দিয়ে ভাজতে হবে খানিকক্ষণ। সামান্য ধনে গুঁড়ো জিরে গুঁড়ো। নুন। দু মিনিট পর কুচোনো টম্যাটো। আধসেদ্ধ হয়ে গেলেই ডালটা দিয়ে দিন। সামান্য চিনি। নাড়তে থাকুন। ধরে না যায়। জল কমে গেলেই ব্যস। আধ চামচ গাওয়া ঘি দিতে পারেন। নাও পারেন। কাজু কিসমিসের একই বক্তব্য।
বালক রবির কল্যবর্ত (জলখাবার) বর্ণনায় পাই, ঠাকুরবাড়ির সব বালকেরা একসঙ্গে আসনপিঁড়ি হয়ে বসতেন। চাকর লুচি পরিবেশনের সময় দুই আঙুলে একটি লুচি ঝুলিয়ে রেখে বলতো ‘ আর দেবো? ‘ চক্ষুলজ্জার খাতিরে পেট কিঞ্চিৎ ভরলেও মন ভরত না। তবে প্রাচীন সংস্কৃতে লুচি শব্দের অনুপ্রবেশ নেই। ‘লোচা’ অর্থাৎ যা পিছলে যায়, এটা লুচিও হতে পারে। আবার গোল আকৃতির জন্যে চোখের মণি বা ‘লোচক‘ও হতে পারে লুচির আদি। কেউ বলে ক্ষুধাবর্ধক মানে কিনা ‘রুচি‘ থেকে লুচির জন্ম। একাদশ শতকে পালযুগে ভিষগ চক্রপানি দত্তর ‘দ্রব্যগুণ‘ লেখায় তিন প্রকার ভাজা খাদ্য অর্থাৎ শাস্কুলির উল্লেখ। খাস্তা, সপ্ত আর পুরি। এর মধ্যে খাস্তার বর্ণনা আমাদের লুচির খুউব কাছাকাছি। লুচি শব্দটা ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে রসিকামঙ্গল নামের বৈষ্ণব গ্রন্থে আছে। এমনি ভাবে হাজার বিবর্তনের হাত ধরে আজকের এই পঞ্চেন্দ্রিয় উন্মাদ করা খাঁটি বাঙালি লুচি। বিত্তবানদের একসময়ের হালকা খাবার।
ময়দা, নুন একটু গুঁড়িয়ে নেওয়া চিনি আর দু চামচ সাদা তেল। ভালো করে সময় নিয়ে মাখতে হবে। মনোমত হলে একটু একটু করে উষ্ণ জল। প্রেমসে। নিজেকে বিহারের প্রত্যন্ত গ্রামের কাসুরী দেবী ভাবুন। ময়দা মাখার একচেটিয়া সরতাজ। হয়ে গেছে? দশ মিনিট অন্তত লাগে এই কুস্তিতে। নাহলে গ্লুটেইন ছাড়বে না ময়দা। স্বাদ আসবে না। ভিজে কাপড় ঢাকা দিয়ে আধ ঘন্টা। ছোট ছোট লেচি। দু হাতের তালুতে এক ফোঁটা তেল দিয়ে লেচি পাকান। হাতের ব্যায়াম হবে। ঠাকুমা বলতেন, লেচিতে সুন্দরীর নাভি হবে, তবে ফুলবে লুচি। কড়ায় তেল গরম করুন। কিপটেমি করবেন না প্লিজ। চাকি বেলন। এক ছিটে তেল মাখিয়ে লেচি থেকে লুচির আকার। হালকা চাপে বেলতে হবে। বিজোড় সংখ্যার টান। তিন বা পাঁচ। তেল গরম হয়েছে তো? সাবধানে লুচি ভাসিয়ে দিন। সাঞ্চার আলতো চাপে আর সাবধানী নাড়াচাড়ায় ফুলকো গর্বিত লুচি। সোনালি রঙের। আদুরে।

বেগুনের গোল চাকায় নুন হলুদ আর কিঞ্চিৎ গুঁড়ো লঙ্কা। মাখিয়ে নিয়ে সর্ষে তেলে চাপা দিয়ে ভাজুন। সর্ষে তেলে ধোঁয়া উঠলে তবেই বেগুন ছাড়বেন। বাদামী দুপাশ হয়ে উঠেছে? বেগুন ভাজা তৈরি। অতিরিক্ত তেল ঝরিয়ে নেবেন কিন্তু।
সর্ষে ফোড়ন দিয়ে কাঁচা আমের চাটনী। একটু নুন। আমাদা বাটা। চিনি লাগে অনেকটা। তাতে কি? খোসা সমেত আমের টুকরো বেশি ভালো লাগে জানেন তো ?
কচি পাঁঠার ঝোল একান্তই বাঙালি আইটেম। গোটা পাঁঠার ওজন যেন ছ সাত কেজির বেশি না হয়। প্রেসার কুকারে সর্ষে তেল। দুটো বড় এলাচ, দারুচিনি,লবঙ্গ,ছোট এলাচ চারটে। গোলমরিচ অল্প কটা । তেজপাতা। এক মিনিট পর কুচোনো পেঁয়াজ। নরম হয়ে এলে আদা রসুন বাটা। কাঁচা লঙ্কা বাটা। অল্প পরিমাণে হলুদ লঙ্কা জিরে আর ধনে গুঁড়ো। একটা টম্যাটো কুচি। মিনিট তিন পর মাংস। পাঁচ মিনিট কষে একটু চিনি, গুঁড়ো গরম মশলা আর পরিমান মত নুন। জলটা গরম দেওয়া উচিত। সবকিছু ঠিকঠাক মিশিয়ে নিন। কুকারের ঢাকনা দিয়ে দুটো সিটি। আঁচ একদম কমিয়ে দিতে হবে। ঠিক বারো মিনিট। সিটি খুলবেন না। আধ ঘন্টা পর ব্যস। মাংস তৈরি। হাপুস হুপুস শব্দ চারদিক নিস্তব্ধ।

ওদের খাওয়া আর গল্প শেষ হতে বিকেল গড়িয়ে গেছে। এবার বিদায়। রাতে মোহরকুটিরে অনুষ্ঠান দেখার আমন্ত্রণ আছে। কতো বছর পর শান্তিনিকেতন ওর মনের খুব কাছাকাছি। এমন সময় ফেলে আসা দিনগুলো সিনেমার রিওয়াইন্ডের মত অদৃশ্য পর্দায় ভাসতে থাকে। বাস্তবে থাকতে হয়। মুঠো করে ধরে রাখা বালি ঝুরঝুর করে আঙুলের ফাঁক খুঁজে নেয়। কবিতার মত কিছু মুহূর্ত জমা থাকে হিপোক্যাম্পাসের এখানে ওখানে। ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায়।

