বুকের মধ্যে সেই যন্ত্রণা। বাইশটা বছর বাদে শাপমুক্তি। ভারতের সব ক্লাবের সেরা ইস্টবেঙ্গল। এই প্রথমবার আইএসএল ফুটবলে সব ক্লাবকে টেক্কা দিয়ে ট্রফি হাতে লাল-হলুদ ব্রিগেডের ফুটবলাররা। ইস্টবেঙ্গল ঘরে জাতীয় স্তরের কোনও টুর্নামেন্টের ট্রফি দেখা নেই। তাই সমর্থকদের অব্যক্ত কষ্টের অনুভূতি থেকে ছুটি পাওয়া গেল। তাই তো লাল-হলুদ পতাকা সারা শরীরে জড়িয়ে সমর্থকরা আনন্দ অশ্রুতে ভেসে গেলেন। নির্ণায়ক ম্যাচে ইস্টবেঙ্গল ২-১ গোলে ইন্টার কাশীকে হারিয়ে স্বপ্নের আকাশটায় লাল-হলুদ আবিরে মাখামাখি হয়ে গেল। এ যেন এক রূপকথার উপাখ্যান। ইস্টবেঙ্গল পারে। আহত বাঘের গর্জন যেমন অরণ্যকে কাঁপিয়ে রাখে, ঠিক তেমনই ইন্টার কাশীর গোল হজম করার পরে ইস্টবেঙ্গলের দাপট দেখতে পাওয়া গেল। ঝড়ের গতিতে আক্রমণের পর আক্রমণ শানিয়ে প্রতিপক্ষ দলকে একেবারে কোণঠাসা করে বাজিমাত করল ইস্টবেঙ্গল। এ এক স্বপ্নের ইতিহাস।
সেই বাইচুং ভুটিয়াদের ভারতসেরা কাহিনি বাইশটা বছর আগে। তারপরে ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে শুধু ট্রফির খরা। খেতাব জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে পিরে আসতে হয়েছে লাল-হলুদ ব্রিগেডকে। তাই এবারে খেতাবি লড়াইয়ে অন্য অঙ্ক দেখা দিয়েছিল। আসলে এই দৌড়টা অন্যরকম ছিল। তাই দাবার বোর্ডে কোন দল কিস্তিমাত করবে, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনায় মুখর ছিল। সেই আলোচনায় সবাইকে চমক দিয়ে ইস্টবেঙ্গল ভারতসেরা সম্মানে মাতোয়ারা হয়ে উঠল। একদিকে ইস্টবেঙ্গল ও ইন্টার কাশীর খেলা। অন্যদিকে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট ও স্পোর্টিং ক্লাব দিল্লি। মোহনবাগানের খেলা যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গণে আর ইস্টবেঙ্গলের লড়াই কিশোরভারতী স্টেডিয়ামে। দুই প্রধানের প্রতিপক্ষরা প্রথমে গোল করে ভয় দেখিয়েছিল। কিন্তু সেই অশনি সংকেত বেশিক্ষণ সংশয় তৈরি করতে পারেনি। রেফারির শেষ বাঁশি বাজানোর আগেই দুই প্রধান জয় তুলে নেয়। লিগ টেবলে দুই দলই একই জায়গায় অবস্থান করলেও, গোল ব্যবধানে মোহনবাগানকে পিছনে ফেলে খেতাব জয়ের উৎসবে মেতে ওঠে ইস্টবেঙ্গল। কিশোরভারতী স্টেডিয়ামে লাল-হলুদ মশাল জ্বলে উঠল।

রংমশালের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল সারা স্টেডিয়ামে। আবেগে আর ভালোবাসায় ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকরা বাঁধনহারা। উৎসবে মাতোয়ারা। পতাকা হাতে নিয়ে স্টেডিয়ামের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেছেন সমর্থকরা। আনন্দের মিলন মেলায় একাকার ইস্টবেঙ্গলের সচল ফুটবলার থেকে শুরু করে কোচ-কর্মকর্তারা। ট্রফি জয়ের উৎসবে সবচেয়ে বেশি খুশি মানুষ কোচ অস্কার ব্রুজো।
খেলার আগে কোচকে একের পর এক বাক্যবাণে জর্জরিত হতে হয়েছিল। সেই আঘাতকে চেপে রেখে অগ্নিপরীক্ষায় সফল হওয়াটা সব কিছুকে ছাপিয়ে যায়। তাই তো কোচ অস্কার ব্রুজো বুক বাজিয়ে বলতে পেরেছেন— বিশ্বাস একদিনে সার্থক রূপ পায় না। গড়ে তুলতে হয় দিনের পরপ দিন পরিশ্রমে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন সাফল্যের রথটা একার দ্বারা টানা সম্ভব হয় না। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে রথটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। বলতে দ্বিধা নেই, সাফল্যের সিঁড়িটা গড়তে হয় দৃঢ়তা, বিশ্বাস, ত্যাগ আর তপস্যার মধ্য দিয়ে। সমর্থকদের আন্তরিকতা আর আবেগ ফুটবলারদের উজ্জীবিত করে। প্রত্যাশা সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে। তাই পরীক্ষায় মুখোমুখি হলে তা কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে, সেই দিকটা তৈরি করতে হয়। এটা মনে রাখতে হবে কেউই যুদ্ধক্ষেত্রে হারার জন্যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় না। একটা লক্ষ্যে পৌঁছতে গেলে কঠোর পরিশ্রমই শেষ কথা বলে।

ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য সমবেত প্রয়াস সবচেয়ে হাতিয়ার। তারই স্পর্শ পাওয়া গেছে ভারতসেরা ইস্টবেঙ্গলের ফুটবল যুদ্ধের মানচিত্রে। সেই জয়ের আলোর রোশনাই চব্বিশ ঘণ্টা বাদেও ইস্টবেঙ্গল ক্লাব চত্বরে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। বাঁধনহারা উৎসবে কে সামিল হননি। সবাই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছেন মিলনমেলায়। সেই আনন্দ উৎসবে নাচছেন। কেউ কাঁদছেন। কেউই ছুটে এসে মিষ্টিমুখ করিয়ে দিচ্ছেন। কেউ আবার প্রতীকী ইলিশ মাছ নিয়ে মাঠের চারদিকে চলেছেন। লাল-হলুদ আবিরে মাখামাখি হয়ে একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরছেন। ফুটবলের দর্শনে এই জয়ের কোনও ব্যাখ্যা হয় না। তবে আবেগ আর ভালোবাসায় তার প্রকাশ ঘটে। আনন্দের জোয়ারে একটা আওয়াজ জয় ইস্টবেঙ্গল।

