বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারকে যে মহান সাহিত্যিকরা মণিমুক্ত দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরোধিতা, যৌবনের জয়গান, প্রান্তিক মানুষের জন্য সাম্যের গান যাঁর লেখায় ফিরে ফিরে আসে। ব্রিটিশ শাসন কালের প্রেক্ষাপটে লেখা তাঁর একাধিক কবিতা ও গান তৎকালীন সময়ে সাধারণ মানুষ থেকে বিপ্লবীদের মধ্যে শিহরণ সৃষ্টি করেছিল এবং ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জয়পতাকা উড়িয়েছিল। তাঁর গানের সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি। এ ছাড়াও রয়েছে কবিতা, প্রবন্ধ, ছোট গল্প, কাব্যানুবাদ, পত্রাবলী, শিশুসাহিত্য, চলচ্চিত্রের কাহিনী প্রভৃতি।

বাংলা সাহিত্যে চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব ‘ধূমকেতু’র মতো। মাত্র তেইশ বছরের সৃষ্টিশীল জীবন ছিল কবির। তাঁর মৃত্যুর পর আমরা পেরিয়ে এসেছি বহু বছর। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি ও জীবনদর্শন আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর লেখার প্রাসঙ্গিকতাই তাঁকে কালোত্তীর্ণ করে তুলেছে।
এবছর চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কলকাতায় সাতদিনব্যাপী ‘আমারে দেব না ভুলিতে’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল নজরুল চর্চা কেন্দ্র ছায়ানট (কলকাতা)। প্রদর্শনীটি যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টসের সুনয়নী চিত্রশালায় ও চিত্ত প্রসাদ গ্যালারিতে ২৩ মে থেকে ৩০মে পর্যন্ত পর্যন্ত চলে। ২৩ মে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। প্রতিদিন দুপুর ২টো থেকে রাত্রি ৮টা পর্যন্ত নজরুল প্রেমীরা প্রত্যক্ষ করেন নজরুল সংক্রান্ত দুষ্প্রাপ্য জিনিস দিয়ে সাজানো এই প্রদর্শনী যার মূল ভাবনা এবং উদ্যোক্তা ছিলেন ছায়ানট (কলকাতা)-র সভাপতি, বিশিষ্ট নজরুল-সঙ্গীত শিল্পী ও গবেষক সোমঋতা মল্লিক।

তিনি বলেন “আমাদের প্রাণের কবির জীবন ও সৃষ্টি সম্পর্কে জনগণকে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে অবগত করার উদ্দেশেই আমাদের এই ৭ দিন ব্যাপী বিশেষ আয়োজন।” দুই বাংলার বিশিষ্ট সংগ্রাহকদের বিরল সংগ্রহ দিয়ে সাজানো হয়েছিল এই প্রদর্শনী। বিশিষ্ট নজরুল গবেষক এমদাদুল হক নূরের সংগ্রহ থেকে নজরুলের হাতে লেখা প্রথম চিঠি (প্রাপ্ত) প্রদর্শনীতে বিশেষভাবে স্থান পায়। কলকাতার বিশিষ্ট অটোগ্রাফ সংগ্রাহক মলয় সরকারের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে কাজী নজরুল ইসলামের স্বাক্ষর যা এই প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ। কাজী নজরুল ইসলামের বেশ কিছু দুর্লভ আলোকচিত্র দেখা যায় বাংলাদেশের সম্মানীয় আলোকচিত্রী সাহাদাত পারভেজ – এর সংগ্রহ থেকে। প্রয়াত আলোকচিত্রী অলক মিত্রর তোলা ছবিও বাদ পড়েনি। ছিল গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বাগত গুপ্ত, আশিক মিঞার সংগ্রহ থেকে নজরুল সংক্রান্ত বেশ কিছু দুর্লভ ছবি।

বিশিষ্ট নজরুল-সঙ্গীত শিল্পী সত্য চৌধুরীর ভ্রাতুষ্পুত্র পরমানন্দ চৌধুরীর সংগ্রহ থেকে কবির স্বকণ্ঠে গান ও কবিতার গ্রামোফোন রেকর্ডও শোনানো হয়। সেই সঙ্গে ঈশিতা বসু রায়ের সংগ্রহ থেকে প্রণম্য শিল্পীদের কণ্ঠে নজরুল-সঙ্গীত ও কবিতার বেশ কিছু দুর্লভ গ্রামোফোন রেকর্ড ও ক্যাসেট প্রদর্শিত হয়।

কলকাতার বিশিষ্ট সংগ্রাহক শৌভিক রায়ের সংগ্রহ থেকে দেখা যায় ভারত,বাংলাদেশ,পাকিস্তানে নজরুলের ওপর নির্মিত ডাকটিকিট। শেখর দে প্রদর্শনীতে সংযুক্ত করেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ৯০ বছর উপলক্ষে বাংলাদেশে নির্মিত বিশেষ মুদ্রা। বাংলাদেশের বিশিষ্ট সংগ্রাহক সাকিল হকের তৈরি বিশেষ দেশলাই বাক্স প্রদর্শনীতে অন্য মাত্রা যোগ করেছিল। নজরুলের ছবি দিয়ে তৈরি দেশলাই বাক্স সত্যিই এক অভিনব সংযোজন।

ফাল্গুনী দত্ত রায়ের সংগ্রহ থেকে ছিল বেশ কিছু দুর্লভ সামগ্রী — নজরুলের ‘ছায়ানট’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম সংস্করণ, ‘অগ্নি-বীণা’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ, বেতার জগৎ-এ নজরুলের বিশেষ সংখ্যা, ডাকটিকিট সহ আরও অনেক কিছু। বিদ্যাপতি, সাপুড়ে, গোরা, চৌরঙ্গী সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নজরুল। ফাল্গুনী দত্ত রায়ের সংগ্রহ থেকে সেই সমস্ত চলচ্চিত্রের বুকলেটস্ প্রদর্শনীতে স্থান পায়।

অপ্রতিম বসুর সংগ্রহ থেকে দর্শকদের নজর কাড়ে নজরুলের ‘চোখের চাতক’ বইয়ের প্রথম সংস্করণ সহ বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য সামগ্রী। ওয়াসিম কাপুর, বাপ্পা ভৌমিক, সুব্রত কর, রাসেল রহমান শিমুল সহ ভারত ও বাংলাদেশের বিশিষ্ট চিত্রশিল্পীদের আঁকা নজরুলের প্রতিকৃতি প্রদর্শনীতে দেখা যায়।

কফি দিয়ে নজরুলের ছবি আঁকেন কফিম্যান পার্থ মুখার্জী। শৌভিক রায়ের সংগ্রহ থেকে ছিল বাংলাদেশে তৈরি সিরামিক প্লেটে নজরুল। মৌটুসী ঘোষের আঁকা ‘আলপনায় নজরুল’, সুবীর বিশ্বাসের তৈরি স্লেট পাথরে নজরুল সহ বিভিন্ন মাধ্যমে নজরুলকে তুলে ধরা হয়েছিল। এছাড়াও প্রতিদিন গ্যালারিতে ‘আরশি কলকাতা’ – এর পক্ষ থেকে চিত্রশিল্পীরা সুমিত গুহর পরিচালনায় লাইভ পেন্টিং করেন যা নজরুল প্রেমীদের কাছে উপরি পাওনা।

নজরুল গবেষক, ছায়ানট (কলকাতা) – এর সভাপতি সোমঋতা মল্লিকের সংগ্রহ থেকে ছিল কিছু পুরনো, দুষ্প্রাপ্য পত্রিকার নজরুল-সংখ্যা, গ্রামোফোন রেকর্ড, ডাকটিকিট। কাজী নজরুল ইসলাম যে বিদ্যালয়ে পড়াশুনো করেছিলেন, সেই বিদ্যালয়ের (রানীগঞ্জের শিয়ারসোল রাজ হাইস্কুল) উদ্যোগে নজরুল জন্ম-শতবর্ষে যে বিশেষ বইটি প্রকাশিত হয়, সেটি প্রদর্শিত হয়েছিল সোমঋতার সংগ্রহ থেকে।

আমাদের প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণের পরের দিনের (৩০ আগস্ট, ১৯৭৬) যুগান্তর পত্রিকা সহ বেশ কিছু কবির খবর সংক্রান্ত পত্রিকাও দেখা যায়।
ভারতবর্ষে নজরুল-স্মৃতি বিজড়িত জায়গাগুলি সম্পর্কে নজরুলপ্রেমীদের অবগত করার উদ্দেশে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে সোমঋতা মল্লিকের পরিচালনায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে ছায়ানট। তারও কিছু ঝলক ছিল এই প্রদর্শনীতে।
নজরুল কলকাতায় যে সব বাড়িতে থেকেছেন, ২০১৮ সালে সোমঋতা মল্লিকের তত্ত্বাবধানে মাসুদুর রহিম রুবাইয়ের ক্যামেরায় তোলা সেই বাড়িগুলির ছবিও প্রদর্শিত হয়।
প্রদর্শনী উদ্বোধনের দিন ছায়ানট (কলকাতা)-র পক্ষ থেকে সংগ্রাহকদের বিশেষ সম্মান প্রদান করা হয়। প্রতিদিন গ্যালারিতে ছিল নজরুলপ্রেমীদের আড্ডা, নজরুল সংক্রান্ত ক্যুইজ ও নজরুল শব্দবাজি। গ্রামোফোন রেকর্ড প্লেয়ারে বাজানো হয়েছিল নজরুল-সঙ্গীত। আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, ভাষার ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরেছিল এই প্রদর্শনী। নজরুলের সৃষ্টি আমাদের দেশের ইতিহাসের অঙ্গ, আমাদের গর্ব। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে নজরুলকে আরও একবার নতুন আঙ্গিকে সকলের সামনে তুলে ধরা হল বলে মত বিশিষ্টজনদের।

